এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

শাহলা উজেইলি’র গল্প – মৃত মানুষের হাত

বাঙলায়ন: জ্যোতির্ময় নন্দী

 

[মূল আরবি থেকে ২০১৯ সালের আরবলিট শর্ট স্টোরি পুরস্কার এবং ইংলিশ পেন ট্রান্সলেটস পুরস্কার বিজয়ী সাওয়াদ হুসাইনের করা ইংরেজি তরজমা অনুসরণে এই বাংলা ভাষান্তরটি তৈরি করা হয়েছে।]

 

শাহলা উজেইলি একজন সিরীয় কথাসাহিত্যিক ও একাডেমিক, যিনি সমকালীন আরবি সাহিত্যে বিশেষ অবদান রেখেছেন। ১৯৭৬ সালে সিরিয়ার রাক্কা শহরে জন্ম নেওয়া উজেইলি আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক আরবি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে ডক্টরেট অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব মাদাবা (জর্ডান)-এ আধুনিক আরবি সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ইতোপূর্বে তিনি আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের মিডলবেরি ভাষা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।

 

তাঁর সাহিত্যকর্মে উপন্যাস, ছোটগল্প এবং সমালোচনামূলক গ্রন্থ সমান গুরুত্ববহ। তাঁর উপন্যাস ‘বেড়ালের চোখ’ (২০০৬) তাঁকে জর্ডানের রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার এনে দেয়, এবং ‘আমাদের বাড়ির কাছে একটি আকাশ’ (২০১৫) আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়ে ২০১৬ সালে ‘আরবীয় উপন্যাসের জন্যে আন্তর্জাতিক পুরস্কার’-এর মনোনয়ন পায়। পরবর্তী উপন্যাস ‘গরমের সময় শত্রুর সাথে’ (২০১৮) আইপিএএফ-এর শর্টলিস্টে স্থান পায়। ছোটগল্প সংকলন ‘শাহজাদির জন্যে বিছানা’ (২০১৬)’র জন্যে তিনি ভূষিত হন কুয়েতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির দেয়া মর্যাদাপূর্ণ আল মুলতাকা পুরস্কারে। তাঁর ছোটগল্পের আরেকটা বই হল ‘জাফরিকাটা জানালা’ (২০০৫)।

 

উজেইলির সমালোচনামূলক রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে ‘অদ্ভুতত্ত্বের আয়না: সাংস্কৃতিক সমালোচনা বিষয়ক প্রবন্ধাবলী’ (২০০৬), ‘সিরীয় উপন্যাস: নিরীক্ষাধর্মিতা ও তত্ত্বীয় শ্রেণিসমূহ’ (২০০৯), এবং ‘আরবি উপন্যাসের নন্দনতাত্ত্বিক পরিচিতি: উপনিবেশিকোত্তর পরিপ্রেক্ষিত’ (২০২০)। তাঁর রচনাগুলি ইংরেজি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

 

উল্লেখ্য, এখানে তাঁর বইগুলোর নাম বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হয়েছে, যদিও তাঁর কোনো কাজ ইতোমধ্যে বাংলায় অনূদিত হয়েছে বলে জানা নেই।

 

তাঁর লেখায় যুদ্ধ, নির্বাসন, পরিচয় সংকট ও নারীবাদী ইতিহাসের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার মিশ্রণে তিনি সমকালীন সিরিয় সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

 

সকালবেলা আমি আমার ইস্পাত-ধূসর হোন্ডা সিভিকটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম সেই ফ্রি ক্লিনিকটার দিকে, যেখানে আমি কাজ করি। ক্লিনিকটা না’উর থেকে উম আল-বসাতিন গ্রামের দিকে চলে যাওয়া মূল সড়কে। আমার সামনে সামনে চলছিল একটা সাদা ভ্যান, দেখতে অ্যাম্বুলেন্সের মতো, তবে ছাদের ওপর লাল নয়, সবুজ আলো জ্বলছিল, আর বড় বড় জানালা গোটা গাড়ির শরীরজুড়ে। একবার আমি ভ্যানটাকে ছাড়িয়ে সামনে চলে গিয়েছিলাম, কিন্তু আবার সেটা আমার গাড়িকে ছাড়িয়ে সামনে চলে গেল। আমি চাইছিলাম ভ্যানটাকে ছাড়িয়ে আবার সামনে চলে গিয়ে মুক্তি পেতে মৃত্যুর পুতিগন্ধ থেকে, যা প্রশান্ত সকালটাকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল। কিন্তু ভ্যানটার চালক আমাকে সে সুযোগ দিল না। ট্রাফিক সিগন্যালে ভ্যানটি পাশে এসে দাঁড়ালে আমি ঘুরে দেখলাম পাশের কাঁচের ভেতর একটি কফিন। আমার স্পন্দমান হৃৎপিণ্ড আর সেই নিথর হৃৎপিণ্ডের মধ্যে মাত্র মিটারখানেকের সেই ব্যবধান আর আমরা নিজের নিজের মতো করে ট্রাফিক আইনকে যেভাবে ব্যাখ্যা করছিলাম, তা আমাকে আমূল নাড়িয়ে দিল।

 

মনে মনে সুরা ফাতিহা পাঠ করতে করতে আবার তাকালাম। আমরা দুজনেই উম আল-বসাতিনের দিকে একই সরু, নিরিবিলি রাস্তা ধরে মোড় নিলাম। ভ্যানটি সামনে থাকায় আমি তার পেছনের দরজায় কাচের নিচে লেখা কথাগুলো পড়তে লাগলাম: “হে প্রশান্ত আত্মা, তোমার প্রভুর দিকে ফিরে যাও, সন্তুষ্ট হয়ে এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করে।” সেই লেখার ওপরে কাঁচে হঠাৎ করেই একটা হাত আঘাত করল। কাচের ওপর এদিক-ওদিক নড়ছিল হাতটা, কখনো মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছিল, আবার শিথিল হচ্ছিল। আমি স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে কেঁপে উঠলাম। মৃত মানুষের হাতটা আমাকে তীব্রভাবে ইশারা করছিল, ডাকছিল।

 

আমি নিজেকে বোঝাতে চাইলাম যে, হয়তো মৃতদেহের সঙ্গে থাকা কেউ আমার দিকে হাত নেড়েছিল। কিন্তু পেছনে যে আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না, সে-ব্যাপারে আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম। মৃত মানুষটি বারবার তার হাতের তালু দেখাচ্ছিল, যেন আমার গলা বা কলার ধরে ফেলবে। সাহায্যের দরকার ছিল তার, আর আমি জানতাম, সব যন্ত্রণাভোগী আত্মা, যারা অপহৃত বা নিহত হয়েছে, তারা জীবিতদের কাছে প্রতিশোধ চাইবে বা মৃত্যুর অন্ধকার পরিস্থিতি প্রকাশ করতে বলবে। কিংবা হয়তো সে এখনো জীবিত!

 

ভ্যানটি যখন কবরস্থানের দিকে মোড় নিল, আমি তাকে অনুসরণ করলাম। ভাবলাম হয়তো মৃতদেহটি কোনো রাজনৈতিক বিরোধী দলের সদস্যের, যাকে নিরাপত্তা বাহিনী নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। অথবা হয়তো সে ছিল শাসক দলের সৈনিক, যাকে বিরোধীরা হত্যা করেছে। কিন্তু শিগগিরই আবার মনে পড়ল, এখানে জর্ডানে এখন তো কোনো ক্ষমতার হানাহানি চলছে না, যুদ্ধ তো দূরের কথা!

 

আমরা কবরস্থানে পৌঁছানোর পর ভ্যানটা দ্রুত গেট পেরিয়ে ভেতরে চলে গেল। হাতটি তখনও উঁচুতে, বার বার কাচে আঘাত করছে, আর যেন আমিই শুধু তা দেখতে পাচ্ছি। গেটে সামরিক পোশাক আর কেফিয়াহ্ পরা এক নারী, হাতে মেশিনগান, আমার গাড়ি থামাল।

 

“কোথায় যাচ্ছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।

 

“আমি কফিনটার সঙ্গে যেতে চাই।”

 

“নারীরা লাশের দাফনে যায় না। এটা শোভন নয়। আসলে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।”

 

আমি ভেতরে আরেকজন নারীকে দেখতে পাচ্ছিলাম। কবর খুঁড়ছিল সে– প্লাস্টিকের বুট পরে, চামড়ার বেল্টে শার্ট গুঁজে, কোদাল দিয়ে কবরের গর্ত থেকে মাটি সরাচ্ছিল।

 

“কিন্তু আপনিও তো নারী,” আমি সাথে সাথে বললাম। “আর ওই যে কবর খুঁড়ছে, সেও নারী। আমি একজন ডাক্তার, হয়তো আপনাদের কোনো কাজে লাগতে পারি।”

 

তার চেহারার কঠোরতা দেখে আমি আর কিছু বলতে সাহস পেলাম না। সে তীব্র গলায় বলল, “ওই মহিলা আর আমি এটা করতে বাধ্য হয়েছি, কারণ খুব বেশি কেউ এটা করতে জানে না। আমাদের সব পুরুষ যুদ্ধেই মারা গেছে, আর মরা মানুষের ডাক্তার লাগে না।”

 

জেগে জেগে দেখা সেই দুঃস্বপ্ন থেকে আমাকে টেনে বের করল পেছন থেকে অন্য গাড়ির হর্নের শব্দ। আমি আমার গাড়িতে গিয়ার দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে এলাম। ভ্যানটিকে তখন কোথাও দেখতে পাই নি।

 

যে রেডিও স্টেশনটা আমি সবসময় শুনি, সকাল ঠিক আটটার সময় সেটা চালু হলে সংবাদ পাঠক জানাল, বিগত যুদ্ধে নিজেদের পরিবার হারানো দুই নারী এলাকার এক শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করেছে।

 

জ্যোতির্ময় নন্দী, কবি ও অনুবাদক, চট্টগ্রাম

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো