এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

বিস্মৃত গবেষক খগেশকিরণ তালুকদার

মানবর্দ্ধন পাল

 

এক.

মুক্তিযুদ্ধ উত্তর বাংলাদেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার রাজনীতিতে খগেশকিরণ তালুকদার একটি অনন্য নাম। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাই তাঁর নামের আগে যুক্ত করা হয় ‘কমরেড’। যারা সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, বিশেষত বামধারার রাজনীতির সঙ্গে, তাদের কাছে এই ‘কমরেড’ উপাধিটি মূল্যবান। ধ্যানজ্ঞান, শিক্ষাদীক্ষা ও সাংগঠনিক কর্মকুশলতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ‘কমরেড’ পদবি অর্জন করতে হয়। কমিউনিস্ট তাত্ত্বিকরা বলেন, মার্কসীয় বস্তুবাদী দর্শন আত্মস্থ করে কমিউনিস্ট ম্যানোফেস্টোতে বিশ্বাস স্থাপন এবং স্বশ্রেণি থেকে বিচ্যুত হয়ে সর্বহারা শ্রেণির সঙ্গে মনেপ্রাণে যুক্ত না-হলে কেউ প্রকৃত কমিউনিস্ট হতে পারেন না। খগেশকিরণ তালুকদার প্রকৃত প্রস্তাবে তা হতে পেরেছিলেন। তাই তাঁর নামের আগে যুক্ত করা হয় ‘কমরেড’। তাঁর বংশপদবি সাক্ষ্য দেয়, তিনি সামন্তপ্রভুর ঘরে জন্মেছিলেন।

 

তালুকদার বংশের শেষ প্রদীপ ছিলেন তিনি— পিতামাতার কনিষ্ঠ সন্তান। ১৯৪৫ (১৩৫২ বঙ্গাব্দ) তাঁর জন্মসন আর মৃত্যুবরণ করেছিলেন ২০০৭ সালে। অকৃতদার এই কমরেড বেঁচেছিলেন বাষট্টি বছর। এই জীবৎকালে তিনি ছিলেন ‘ত্রিকালদর্শী’। জন্মেছিলেন ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষে, তাঁর ছাত্রজীবন কেটেছে ঔপনিবেশিক পাকিস্তানে আর মৃত্যু অবধি কর্মজীবন অতিবাহিত হয়েছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ উত্তর কালে মার্কসীয় দর্শনে দীক্ষিত হয়ে ‘কমরেড’ হয়েছিলেন। অপ্রিয় সত্য হলেও লক্ষ করেছি, কমরেডদের মধ্যেও অভিজাত এবং অনভিজাতের ব্যবধান। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আগত এই কমরেডরা পুঁথিগত বিদ্যায় মার্কসবাদে দীক্ষিত হলেও মনমানসিকতায় যথার্থ ‘শ্রেণিচ্যুত’ হতে পারেননি। কথায় ও কর্মে তাদের তফাৎ ছিল। শ্রেণিচ্যুত হওয়া তো সহজ কথা নয়! নিজের বিরুদ্ধেই অবিরত সংগ্রাম করতে হয়। সব বাউল যেমন সংসার-বিবাগী হয় না তেমনই সব কমিউনিস্টরা শ্রেণিচ্যুত কমরেড নন। এ দেশীয় বামপন্থীদের চরিত্র সেই সাক্ষ্যই দেয়। তাই অজয় রায়েরা যে-ধরনের কমিউনিস্ট, জ্যোতিষ বসু বা মহাদেব সান্যালেরা সে-ধরনের কমিউনিস্ট নন। এই ভিন্নতা ও বৈপরীত্য এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে কেবল দ্বিধাগ্রস্ত করেনি, বহুধায় বিভক্তও করেছে। এই বিভক্তি যত-না আদর্শিক তার চাইতে বেশি নেতৃত্বের। তাই এই ছোট দেশেও কত ব্র্যাকেটবন্দি তথাকথিত বামপন্থি দল।

 

খগেশকিরণ তালুকদার সামন্ত পরিবারে জন্মেও ‘অভিজাত’ কমরেড ছিলেন না। তিনি কষে লাল মলাটের বই পড়েছিলেন এবং তা আত্মস্থও করেছিলেন। সবার সব ধরনের বিদ্যা হজম হয় না! অনেকেরই তা বদহজম হয় এবং বদহজম যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনই বদহজমের বিদ্যা মস্তিষ্কের জন্য বিভ্রান্তিকর। খগেশকিরণ মার্কসীয় বস্তুবাদী দর্শন হজম করেছিলেন। তাই সেই অধীত বিদ্যা তাঁর জন্য ছিল স্বাস্থ্যকর। শ্রেণিচ্যুত হয়ে সেই দর্শনকে তিনি জীবন ও কর্মে সাধ্য মতো প্রয়োগ করেছেন। এখানেই খগেশকিরণ তালুকদারের অনন্যতা। আমাদের পূর্বপ্রজন্মের কমিউনিস্টদের মধ্যে লক্ষ করা যায়, তারা অধিকাংশই সংসার করেননি— আমৃত্যু অবিবাহিত ছিলেন। সাংগঠনিক কর্মযজ্ঞে তারা জীবনকে এমনভাবে উৎসর্গ করেছিলেন যে, সংসার এবং ব্যক্তিগত সুখস্বাচ্ছন্দ্য তাঁরা অকাতরে বিসর্জন দিয়েছিলেন শোষিত গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে। খগেশকিরণ তালুকদার ছিলেন ময়মনসিংহ জেলায় সেই ধারার শেষ প্রতিনিধি।

 

দুই.

সকলেই না-হলেও কমিউনিস্ট কর্মী ও সংগঠক অনেকেই হতে পারেন কিন্তু বস্তুবাদী দর্শনে দীক্ষিত লেখক অঙুলিমেয়। আবার লেখক যৎসামান্য পাওয়া গেলেও গবেষক একেবারেই আণুবীক্ষণিক। আমার ধারণা, খগেশকিরণ তালুকদার লেখক ছিলেন অবশ্যই কিন্তু তিনি সাধারণ লেখক ছিলেন না— ছিলেন গবেষক। গবেষক হিসেবেও তাঁর অসাধারণত্ব এখানে যে, তিনি প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক ছিলেন না। শতেক বইপত্র সংগ্রহ করে এখান-ওখান থেকে মেরে-কেটে তিনি গবেষণাপত্র রচনা করেননি। খগেশকিরণ তালুকদারের গবেষণামূলক রচনা তিন দিক থেকে মৌলিক :

১) বাংলার লোকায়ত শিল্প-সংস্কৃতিকে মার্কসীয় দৃষ্টিতে মূল্যায়ন।

২) বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক মূল্যায়ন।

৩) লোককবি নিবারণ পণ্ডিতকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।

এই তিনটি ক্ষেত্রেই তিনি মৌলিক কাজ করেছেন। মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমাজতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদী। মানবজাতির উদ্ভব ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশের ইতিহাসকে দিকদর্শন চিহ্নিত করে তিনি লোকজ বাংলার সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো মূল্যায়ন করেছেন। কৃষি ও মাছশিকারের সরঞ্জাম থেকে সুর, সংগীত,  বাদ্য, চিত্রকলা থেকে নৃত্যকলা— সবকিছুই-যে সাধারণ মানুষের শ্রমশক্তির সঙ্গে যুক্ত, এই মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে খগেশকিরণ তালুকদার ছিলেন একনিষ্ঠ। একজন নিষ্ঠাবান সমাজবিজ্ঞানীর বস্তুবাদী দৃষ্টিতে তিনি বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের ব্যাখ্যা করেছেন।

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত খগেশকিরণ তালুকদারের বাংলাদেশের লোকায়ত শিল্পকলা (১৯৮৭) বইটি কৃশতনু ও মেদহীন— মাত্র ঊননব্বই পৃষ্ঠা বই। মেদহীন হলেও বইটি বিষয়বস্তু ও কাঠামোগত বিন্যাসে এমনই সুঠাম যে, লোকায়ত শিল্পকলার গভীরতম অন্তর্লোকস্পর্শী। বইটির শুরুতেই লেখক লোকায়ত শব্দটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন :

বাঙালির তথা ভারতীয় ঐতিহ্যে ‘লোকায়ত’ (লোকেষু আয়ত) শব্দটির মানে একাধারে জনগণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত এবং বস্তুবাদী দুই-ই। সেদিক থেকে লোকায়ত শিল্পকলা মানে জনগণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত শিল্পকলা তো বটেই, আবার শুধু বস্তুগত (সধঃবৎরধষ) শিল্পকলাই নয়, বস্তুবাদী (সধঃবৎরধষরংঃ) শিল্পকলাও বটে।…

অতএব, শিল্পকলার উদ্ভব যেহেতু সামাজিক মানুষের বাস্তব কর্মপ্রবাহে আর লোকায়ত শিল্প যেহেতু সেই আদিম শ্রম-সংশ্লিষ্ট শিল্পেরই প্রত্যক্ষ ঐতিহ্যবাহী, সেজন্য, বাংলাদেশের লোকশিল্পের আলোচনা বাংলাদেশের সমাজ, বিশেষত লোকায়ত সমাজের বৈশিষ্ট্য-বৈচিত্র্যের আলোকে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

এই ভূমিকার পর লেখক বিষয়বস্তুকে অনেকগুলো উপশিরোনামে ভাগ করে আলোচনা করেছেন। সেগুলো অনুধাবন করলে বইটি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। লেখকের উপশিরোনামগুলো নিম্নরূপ :

১) প্রেক্ষাপট

২) যোষিৎ-প্রচলিত শিল্পকলা

৩) চিত্রকলা

৪) নকশী কাঁথা

৫) নকশী পাখা

৬) শীতল পাটি

৭) রন্ধনকলা

৮) অন্ন-ব্যঞ্জন

৯) পিষ্টক-পরমান্ন

তারপর গবেষক খগেশকিরণ তালুকদার বৃত্তিনির্ভর শিল্পকলা অধ্যায়ে বাংলার কুটিরশিল্প, কারুশিল্প ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি বৃত্তিনির্ভর বিষয়কে নিম্নোক্ত ভাগে বিভক্ত করেছেন:

১) মৃৎশিল্প

২) কালধর্মী মৃৎশিল্প

৩) কালজয়ী মৃৎশিল্প

৪) বস্ত্রবয়ন শিল্প

৫) স্বর্ণ-লৌহ-কাংস্য শিল্প

৬) কাষ্ঠশিল্প

৭) নৌশিল্প

৮) শঙ্খশিল্প

৯) গজদন্তশিল্প

১০) পাথর-শিল্প

১১) মাছধরা সরঞ্জাম

১২) বাঁশবেতের শিল্প

১৩) পট-চিত্রণ

১৪) বাস্তুশিল্প

১৫) গৃহনির্মাণ শিল্প

১৬) গৃহনির্মাণের কারুকৃতি

বাংলার লোকসমাজে গৃহনির্মাণের মধ্যেও আছে বিচিত্র শিল্পকলার প্রকৌশল। শন-বাঁশ-বেত দিয়ে নির্মিত হতো দোচালা-চৌচালা-আটচালা ঘর। তাতে বাইরে-ভেতরে থাকত বিভিন্ন ধরনের আলপনা, দারু ও কারুশিল্প। জলটুঙি ঘর ছিল সামন্ত অভিজাত শ্রেণির গ্রীষ্মকালীন আবাস। বার-বাংলার ঘর বা বসার ঘর থাকত সুদর্শন কারুকার্যময়। সেকালের ঘরামিরা শন-বাঁশ-বেত দিয়ে ঘরকে নিখুঁত শিল্পমণ্ডিত করে তুলত। লেখক মৈমনসিংহ গীতিকা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলার ঘরামির প্রশংসা করেছেন :

কামলার কাম বিনোদ তাও ভালা জানে।

ভালা কইরা বান্ধে বাড়ী সুত্যা নদীর কানে।।

আটচালা চৌচালা ঘর বান্ধিয়া সুন্দর।

ভালা বান্ধে বিনোদ বার-দুয়াইরা ঘর।।

শীতল পাটি দিয়া বিনোদ দিল ঘরের বেড়া।

উলুছনে ছাইল চাল দেখতে মনোহরা।।

ঝাপে ঝুপে করে বিনোদ কামলার কাম।

দেখিতে সুন্দর বাড়ী চান্দের সমান।।

ভিতরবাড়ি, বাইরবাড়ির ঘর, বাংলাঘর, বারদুয়ারি ঘরের এমন চৌকস বর্ণনা মৈমনসিংহ গীতিকার বিভিন্ন পালায় পাওয়া যায়। তাতে বাংলার বৃত্তিশিল্পের উৎকর্ষের পরিচয় মিলে। গবেষক খগেশকিরণ তালুকদার মধ্যযুগের সাহিত্য ও সমাজতত্ত্ব বিশ্লেষণ করে মার্কসীয় শিল্পতত্ত্বের আলোকে বাংলার শ্রম-সংশ্লিষ্ট লোকায়ত শিল্প ও সংস্কৃতির পরিচয় দিয়েছেন। বলতে দ্বিধা নেই, লালমাটের বই তো তাঁর আত্মস্থ ছিলই অধিকন্তু মার্কসবাদী বাঙালি পণ্ডিত গোপাল হালদার, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ড. অতুল সুর, ড. আহমদ শরীফের মতো তাত্ত্বিকদের তুল্যমূল্যে তিনি বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেছেন।

 

তিন.

বাংলাদেশের আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলতে আমরা যাদের বুঝি তারা নিঃসন্দেহে দেশের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী। প্রাচীন কাল থেকে তারা সামন্তবাদী শোষণে জর্জরিত। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর তারা আবদ্ধ হয়েছে অক্টোপাসের মতো ‘মহাজনী’ শোষণে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবেও তারা পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমল থেকে বহু ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার। নানা ছলচাতুরিতে ভূমিদস্যুরা আদিবাসীদের জমিজমা ও সম্পত্তি আত্মসাৎ করে চলেছে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সরেজমিনে লেখা কলাম-সংকলনে এসবের বাস্তব বিবরণ পাওয়া যায়। (সে-প্রসঙ্গ ভিন্নতর। উৎসাহী পাঠক ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীদের ওপর শোষণের বাস্তব চিত্র জানতে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গদ্য-সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড বা আমার আত্মজৈবনিক বই অনামির আত্মবিন্দুর ‘আমার হালুয়াঘাট : দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ প্রবন্ধটি পড়তে পারেন)।

 

খগেশকিরণ তালুকদারের দ্বিতীয় কৃতিত্ব হলো বৃহত্তর ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায় নিয়ে মৌলিক গবেষণা। আমরা জানি, ভারতের আসাম ও মেঘালয় সংলগ্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চল শ্রীবর্দি, নালিতাবাড়ি, হালুয়াঘাট, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ইত্যাদি এলাকাজুড়ে প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এখানে বলা আবশ্যক, খগেশকিরণ তালুকদারের জন্মস্থানও সেই আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকা কলমাকান্দায়। তিনি শৈশব থেকে দেখেছেন এবং আত্মস্থ করেছেন তাদের ভাষা, জীবনাচরণ, লৌকিক ধর্ম ও সংস্কৃতি। কর্মজীবন ময়মনসিংহ শহরে কাটালেও জীবনের মূলসত্তা জন্মশিকড় থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি। আমৃত্যু তাঁর সংযোগ জন্মস্থান এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে। তাঁর অঞ্চল এবং আশেপাশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বাস করত গারো, হাজং, ডালু, কোচ, হদি, রাজবংশী বানাই প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা। এদের নিয়ে তিনি মাঠপর্যায়ে কাজ করে তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং তথ্য-উপাত্ত সাজিয়ে মৌলিক গবেষণাকর্মে রূপান্তর করেছেন।

 

আদিবাসীদের নিয়ে খগেশকিরণ তালুকদারের গবেষণাপত্রটির শিরোনাম বৃহত্তর ময়মনসিংহের উপজাতিদের পরিচয়। সাতাশ পৃষ্ঠার এই সুদীর্ঘ প্রবন্ধে লেখক পৌরাণিক যুগের প্রাগজ্যোতিষপুর, যা ঐতিহাসিক কালে কামরূপ নামে অভিহিত, সেই ইতিহাস টেনে এদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আগমনের কথা বর্ণনা করেছেন। তথ্য-উপাত্তসহ বিগত দুই হাজার বছরের ইতিহাসের সূত্র অবলম্বন করে উত্তর ময়মনসিংহে আদিবাসীদের আগমনের ঐতিহাসিক বিবরণ দিয়েছেন। তারপর প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং ভাষিক স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছন। প্রবন্ধের শেষ দিকে আদিবাসীদের চাষবাস, উৎপাদন ব্যবস্থা, মাতৃতান্ত্রিক পরিবার ও পারিবারিক সম্পদের বণ্টনব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। গারোদের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে লেখকের পর্যবেক্ষণ নিম্নরূপ :

শ্রেণিহীন আদিম সাম্যবাদী সমাজের অবশেষ সমূহ গারো সমাজ সংগঠনে অদ্যাবধি বিদ্যমান। গারোদের জীবিকার্জনের বিশেষ পদ্ধতি অর্থাৎ জুমচাষ প্রকৃতিগতভাবেই ভোগের জন্য উৎপাদনের সীমায় সাধিত। আবার জুমচাষ স্বল্পাধিক যাযাবর বৃত্তির গুণ।

 

চার.

যেকোনো জাতিসত্তার পরিচয়-পতাকা তার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলা। এসব লালনপালন, ধারণ ও প্রকাশ করেন দেশের শিল্পী-সাহিত্যিক, লেখক-বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা। বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়বাহী কৃতীসন্তানদের জীবন ও কর্ম তুলে ধরতে বিগত শতকের নব্বই দশকে বাংলা একাডেমি জীবনী গ্রন্থমালা প্রকাশের একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের অধীনে খগেশকিরণ তালুকদারের গ্রন্থ নিবারণ পণ্ডিত (১৯১৫-১৯৮৪) বাংলা একাডেমি থেকে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। পূর্ব-ময়মনসিংহের প্রায় বিস্মৃত লোককবি ছিলেন নিবারণ পণ্ডিত। রহস্যময় জীবন-জগৎ ও মানুষের সংগ্রামশীলতার কথা তিনি কবিতায় প্রকাশ করেছেন লোকভাষায়। সমসাময়িক কালে নিবারণ পণ্ডিতের কবিতা মানুষের মনে ব্যাপক আশা ও আনন্দের সঞ্চার করেছিল। মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও শোষণমুক্তি তাঁর কবিতার প্রধান গুণ। রচনার প্রচুর নমুনাসহ এই কবির জীবন ও কর্ম খগেশকিরণ তালুকদার বিশ্বস্ততার সঙ্গে গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। বইটির ভূমিকায় বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মাহমুদ শাহ কোরেশী লিখেছেন :

পূর্ব-ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোক-ঐতিহ্যধারায় লালিত ও পরিপুষ্ট হয়েছে নিবারণ পণ্ডিতের জীবন ও শিল্পীমানস। পারিবারিক ঐতিহ্য-সূত্রে কৈশোরেই কবিতা ও সঙ্গীত রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গণঐতিহ্যধারার শিল্পমাধ্যমে স্বীয় কল্পনাশক্তির প্রকাশে আজীবন নিয়োজিত ছিলেন তিনি। অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক জীবনচর্চায়ই ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার অঙ্গীকার।

লোকসাহিত্য-গবেষক খগেশকিরণ তালুকদার, বর্তমান গ্রন্থে কবি নিবারণ পণ্ডিতের জীবনালেখ্য রচনা করেছেন।

 

খগেশকিরণ তালুকদারের সারিগান প্রবন্ধটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেহনতি মানুষের শ্রমঘনিষ্ঠ সারিগান বাংলা সঙ্গীতের আদিমাতা। সারিগান মূলত শ্রমজীবী মানুষের সম্মেলক গান। ধানকাটা, ধানভানা, ছাদ-পেটানো, ধানরোপণ ইত্যাদি কাজের সময় সম্মিলিতভাবে কর্মজীবীরা যে গান গায় তাকে বলা হয় সারিগান।

ড. আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একে বলেছেন ‘কর্মসঙ্গীত’। খগেশকিরণ তালুকদার সারিগানের সংজ্ঞা নিরূপণ করতে গিয়ে লিখেছেন :

সারি বা শ্রেণিবদ্ধভাবে বহু লোক একই কাজ করার সময় সেই কর্মপ্রেরণা ও কর্মের ছন্দ থেকে উৎসারিত গানকে ‘সারিগান’ বলে।

 

সারিগান লোকজীবনের শ্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। খগেশকিরণ তালুকদার লিখেছেন :

এগুলো আদি অকৃত্রিম শ্রমসঙ্গীত। এই সব গানের তাল-মান-ছন্দ থেকে ক্রমশ সারিগানের উদ্ভব। আদিমতম কর্মসঙ্গীতের প্রত্যক্ষ ও ধারাবাহিক উত্তরসূরি বলে সারিগানকে বলা যেতে পারে বাংলাদোশের আদি-অকৃত্রিম গান।

তারপর লেখক উদ্ধৃতিসহ বাংলাদেশের বিচিত্রবিধ  সারিগানের পরিচয় দিয়েছেন।

 

পাঁচ.

কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বা নেতা হিসেবে খগেশকিরণ তালুকদারকে আমি অশ্রদ্ধা করি না। বরং শ্রেণিত্যাগী সাচ্চা কমিউনিস্ট হিসেবে তিনি শ্রদ্ধাভাজন। তাঁকে স্যালুট জানাই একারণে যে, বিগত শতকের নব্বই দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন এদেশের কমিউনিস্ট শিবিরকে যেভাবে তছনছ করে দিয়েছিল, তাতেও তিনি ছিলেন বিশ্বাসে অনড়-অটল। অচলায়তনের মতো চূড়ায় লাল ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পার্টির ভাঙনের বিরুদ্ধে। পার্টির বাঘা নেতাদের তখন দেখেছি, ভাঙনের স্রোতে গা ভাসিয়ে মতান্তরিত ও আদর্শচ্যুত হতে। কিন্তু খগেশকিরণ তালুকদারের আদর্শিক শক্তি এমনই প্রবল ছিল যে, দিকদর্শন যন্ত্রের মতো তিনি সর্বদা ছিলেন উত্তরায়ণে। তবে আমার ধারণা, খগেশকিরণ তালুকদার কমরেডের চাইতে মার্কসবাদী লেখক হিসেবে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর কর্মজীবনে লক্ষ করা যায়, পার্টির চাইতে তিনি বেশি সময় দিয়েছেন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনে। তিনি যুক্ত ছিলেন সুকান্ত সংসদ, আমরা সমুদ্রমুখী, সুন্দরম, উদীচী এবং প্রগতিশীল শিক্ষকদের সংগঠন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সঙ্গে। পার্টি বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভাবিকাল তাঁকে মনে রাখবে কিনা জানি না তবে মার্কসবাদী লেখক ও গবেষক হিসেবে তিনি আরো বহুকাল স্মরিত হবেন। তাই তাঁর রচনাবলির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হওয়া জরুরি।

 

মানবর্দ্ধন পাল, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো