বিশ্বজিৎ মণ্ডল
শহরের কোলাহল যখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, ঠিক তখন অবিনাশের দিন শুরু হয়। অবিনাশ একজন চিত্রশিল্পী। তবে তার ক্যানভাস সাধারণ দিনের আলো চেনে না, চেনে রাতের নিঝুম অন্ধকার। সাধারণ মানুষ যা দেখে ভয় পায় কিংবা এড়িয়ে যায়, অবিনাশের চোখ সেখানে খুঁজে পায় এক আদিম, অদ্ভুত সৌন্দর্য।
তার কাঁধে ঝোলানো একটা চামড়ার ব্যাগ। তাতে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন শেডের চারকোল পেন্সিল, স্কেচবুক, আর একটা ছোট রিচার্জেবল ইমার্জেন্সি লাইট। অবিনাশের বিশ্বাস, আলোর নিজস্ব কোনো রূপ নেই; আলো কেবল অন্ধকারকে প্রকাশ করার একটা বাহন মাত্র। তাই প্রতি রাতে ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা ছুঁইছুঁই, অবিনাশ বেরিয়ে পড়ে এক অদ্ভুত নেশায় রাতের অন্ধকারের নিজস্ব রূপচ্ছবি খুঁজতে।
প্রথম প্রহর: গলির মোড়ে একাকী ছায়া
আজকের রাতটা একটু অন্যরকম। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, চাঁদের আলো যেন মেঘের কারাগারে বন্দি। বাতাসটা ভারী আর স্যাঁতসেঁতে। অবিনাশ হাঁটছিল শহরের এক পুরনো, পরিত্যক্ত মহল্লার দিকে। এখানকার চুনকাম খসে পড়া দেয়াল আর ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে হলুদ আলো এক অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করে।
হাঁটতে হাঁটতে অবিনাশ একটা গলির মুখে এসে থমকে দাঁড়াল। ল্যাম্পপোস্টের আলোটা সেখানে কাঁপছে যেন কোনো এক অদৃশ্য হাত ওটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ঠিক সেই আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আছে একটা অবয়ব।
স্বাভাবিক কোনো মানুষ গভীর রাতে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে না।
অবিনাশ চোখ সরু করে দেখল। অবয়বটি লম্বা, অস্বাভাবিক রকমের লম্বা। তার পরনে একটা জরাজীর্ণ কালো কোট, যা মাটির কাছাকাছি এসে শেষ হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ল্যাম্পপোস্টের আলোটা তার ওপর পড়লেও, মাটিতে তার কোনো ছায়া পড়ছে না! বরং তার শরীরের চারপাশ থেকে একটা ঘন কালো ধোঁয়া যেন চারপাশের অন্ধকারকে আরও গিলে খাচ্ছে।
ভয়? না, অবিনাশের ডিকশনারিতে ভয় শব্দটা অনেক আগেই মুছে গেছে। তার ভেতরে জেগে উঠল এক তীব্র শিল্পতৃষ্ণা। সে আলতো পায়ে একটা ভাঙা পাঁচিলের আড়ালে বসল। ব্যাগ থেকে বের করল তার মোটা স্কেচবুক আর ৪বি চারকোল পেন্সিল।
খসখস শব্দে পেন্সিল চলতে লাগল কাগজের বুকে। অবিনাশ আঁকতে লাগল সেই অদ্ভুত অবয়বটিকে। পেন্সিলের টানে ফুটে উঠল সেই অতিপ্রাকৃতিক দীর্ঘ দেহ, আলোর অনুপস্থিতি এবং ল্যাম্পপোস্টের সেই মুমূর্ষু আলো। অবিনাশ যখনই অবয়বটির মুখচ্ছবি আঁকার জন্য তার দিকে তাকাল, সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
অবয়বটির কোনো মুখ নেই। সেখানে কেবল একটা শূন্যতা, একটা অন্তহীন কালো গহ্বর। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অবিনাশের মনে হলো সেই শূন্যতাও যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
স্কেচটা শেষ হতেই এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস অবিনাশের পাশ দিয়ে বয়ে গেল। সে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখল, ল্যাম্পপোস্টের নিচের সেই জায়গাটা সম্পূর্ণ খালি। কেউ কোথাও নেই। অবিনাশ স্কেচবুকের দিকে তাকাল। চারকোলের কালিতে অবয়বটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অবিনাশ মৃদু হাসল, “অপূর্ব!”
দ্বিতীয় প্রহর: পুরনো হ্রদ আর জলপরী
শহরের প্রান্তসীমানায় একটা পুরনো হ্রদ আছে। লোকমুখে শোনা যায়, বহু বছর আগে এখানে এক রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছিল। এখন সেখানে শুধুই আগাছা আর থমথমে জল। অবিনাশ হাঁটতে হাঁটতে সেই হ্রদের পাড়ে এসে পৌঁছাল। রাত তখন দুটো।
হ্রদের জল আজ আয়নার মতো স্থির। আকাশে মেঘ কিছুটা কেটে গেছে, ফলে হালকা চাঁদের আলো এসে পড়েছে জলের বুকে। অবিনাশ একটা পাথরের ওপর বসল। ঠিক তখনই হ্রদের মাঝখানে একটা মৃদু আলোড়ন তৈরি হলো। স্থির জলে ঢেউ উঠল।
অবিনাশ সোজা হয়ে বসল। সে দেখল, জলের নিচ থেকে কিছু একটা ওপরে উঠে আসছে। কোনো জলজ প্রাণী নয়, কোনো মানুষও নয়। জল ফুঁড়ে বেরিয়ে এল একটা অবয়ব, যার ওপরের অংশটা একজন নারীর মতো, কিন্তু তার ত্বক চাঁদের আলোর চেয়েও সাদা, প্রায় স্বচ্ছ। আর তার চুলগুলো যেন জলের তলার শ্যাওলার মতো সবুজ এবং জীবন্ত, যা বাতাসে নয়জলের ভেতরে যেভাবে ভাসে, ঠিক সেভাবে ভাসছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তার চোখ দুটো। সেই চোখে কোনো মণি নেই, সম্পূর্ণ সাদা। অবয়বটি জলের ওপর ভেসে থেকে আকাশের চাঁদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তার আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা এবং সুচালো।
অবিনাশ আর সময় নষ্ট করল না। তার আঙুলগুলো চারকোলের ওপর জাদুকরের মতো চলতে লাগল। সে হ্রদের জলের সেই মৃদু কম্পন, চাঁদের আলোর প্রতিফলন আর সেই জলের দেবীর (কিংবা ডাইনির) অতিপ্রাকৃতিক রূপ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে লাগল।
আঁকার মাঝখানেই সেই সত্তাটি হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে সরাসরি অবিনাশের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক হাড়হিম করা হাসি। কিন্তু অবিনাশের তুলি বা পেন্সিল থামল না। সে সেই হাসির ভেতরে থাকা আদিম একাকিত্বকে কাগজে বন্দি করতে চাইল। স্কেচটি শেষ হতেই একটা তীব্র ডাইভ দেওয়ার শব্দ হলো, আর সত্তাটি জলের গভীরে মিলিয়ে গেল। হ্রদের জল আবার শান্ত হয়ে গেল, যেন কিছুই হয়নি।
অবিনাশ স্কেচবুকের পাতা ওল্টাল। জল আর অন্ধকারের এই মেলবন্ধন তার সংগ্রহের অন্যতম সেরা কাজ হয়ে রইল।
তৃতীয় প্রহর: পরিত্যক্ত থিয়েটার ও ছায়ার নাচ
রাত যখন সাড়ে তিনটে, অবিনাশ এসে পৌঁছাল শহরের শতবর্ষ প্রাচীন ‘রয়্যাল থিয়েটার’-এর সামনে। বহু বছর আগে এক ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর থেকে এটি পরিত্যক্ত। ভাঙা ছাদ, ঝুলে থাকা লোহা আর পোড়া কাঠের গন্ধ এই জায়গাটাকে এক ভৌতিক রূপ দিয়েছে। সাধারণ মানুষ দিনের বেলাতেও এর আশেপাশে ঘেঁষে না। কিন্তু অবিনাশের জন্য এটাই স্ব্গ।
সে ভাঙা দরজা গলে ভেতরে ঢুকল। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। অবিনাশ তার ইমার্জেন্সি লাইটটা জ্বালল না, কারণ সে চায় তার চোখ এই অন্ধকারের সাথে মানিয়ে নিক। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবছা আলো-ছায়ায় থিয়েটারের ভেতরের ভাঙা স্টেজটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
অবিনাশ অডিটোরিয়ামের একটি অক্ষত চেয়ারে বসল। হঠাৎ করেই তার কানে এল মৃদু মিউজিকের শব্দ। কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজছে না, যেন বাতাসই এক অদ্ভুত ভায়োলিনের সুর তৈরি করছে।
পরমুহূর্তেই স্টেজের ওপর একটা আলো জ্বলে উঠল। কোনো লাইট নেই, তাও স্টেজটা নীলচে আলোয় ভরে গেছে। আর সেই স্টেজে নাচছে একদল ছায়া। হ্যাঁ, তারা কোনো মানুষ নয়। তারা কেবল মানুষের আকৃতির ছায়া, কিন্তু দেয়াল বা মাটিতে প্রজেক্টেড নয়, তারা শূন্যে ভাসমান ত্রিমাত্রিক ছায়া।
তারা নিখুঁত ছন্দে নাচছে। তাদের প্রতিটি মুভমেন্ট এত সাবলীল অথচ এত অস্বাভাবিক যে সাধারণ মানুষ দেখলে মূর্ছা যেত। অবিনাশ মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগল। এই দৃশ্য না আঁকলে তার শিল্পীজীবন বৃথা।
সে ব্যাগ থেকে একটা বড় ড্রয়িং শিট বের করল। এবার সে শুধু চারকোল নয়, পকেট থেকে বের করল কিছু বিশেষ খড়িমাটি এবং ডার্ক ব্লু প্যাস্টেল কালার। অন্ধকারের বুকে নীল আলোর সেই অপার্থিব নাচ সে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে লাগল। তার হাত দ্রুত চলছিল, কারণ সে জানত ভোর হতে আর বেশি সময় নেই।
ছায়াদের সেই নাচ ছিল একই সাথে সুন্দর এবং করুণ। যেন তারা কোনো এক অতীত স্মৃতির বন্দি, যা প্রতি রাতে এখানে এসে মুক্তি খোঁজে। অবিনাশের স্কেচে সেই ছায়াদের গতিশীলতা, নীল আলোর বিষাদ আর থিয়েটারের কঙ্কালসার রূপ একাকার হয়ে গেল।
হঠাৎ করেই দূরের গির্জা থেকে চারটে বাজার ঘণ্টা ধ্বনিত হল। আর সাথে সাথেই, যেন কোনো জাদুমন্ত্রে, স্টেজের নীল আলো দপ করে নিভে গেল। ছায়ারা মিলিয়ে গেল বাতাসে। থিয়েটার আবার সেই পুরনো, নিস্তব্ধ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল।
শেষ প্রহর: ভোরের আলো এবং শেষ তুলির টান
অবিনাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার ড্রয়িং শিটটা গুটিয়ে নিল। তার সারা গায়ে ক্লান্তি, কিন্তু মনে এক পরম তৃপ্তি। প্রতি রাতের মতো আজকেও সে অন্ধকার থেকে কিছু অমূল্য রত্ন চুরি করে এনেছে।
সে থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে শহরের বড় রাস্তাটার দিকে হাঁটতে লাগল। পুব আকাশে তখন কালচে নীল রঙ বদলে হালকা বেগুনি আর কমলার ছোঁয়া লাগছে। ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। এই আলো অবিনাশের শত্রু। আলো বাড়ার সাথে সাথে তার এই অদ্ভুত চেনা পৃথিবীটা আবার সাধারণ, একঘেয়ে মানুষের পৃথিবীতে রূপ নেবে।
নিজের স্টুডিওতে ফিরে এসে অবিনাশ স্কেচবুকগুলো টেবিলের ওপর রাখল। সারারাত ধরে আঁকা স্কেচগুলোর দিকে সে তাকিয়ে রইল।
প্রথম স্কেচ: মুখহীন, ছায়াহীন সেই দীর্ঘ অবয়ব।
দ্বিতীয় স্কেচ: হ্রদের জলের সেই শ্বেতশুভ্র জলদেবী।
তৃতীয় স্কেচ: পরিত্যক্ত থিয়েটারের শূন্যে ভাসমান নীল ছায়ার দল।
অবিনাশ অনুভব করল, এই ছবিগুলো কেবল কাগজের টুকরো নয়। এগুলো রাতের অন্ধকারের সেই গোপন সত্তাগুলোর আত্মা, যা তারা অবিনাশের মাধ্যমে এই পৃথিবীতে রেখে গেছে।
সে স্টুডিওর জানালাটা খুলে দিল। ভোরের আলো এসে পড়ল তার ক্যানভাসগুলোর ওপর। অবিনাশ চারকোল মাখা হাত দুটো ধুয়ে এক কাপ কড়া কফি বানিয়ে জানালার ধারে এসে দাঁড়াল। শহরটা জেগে উঠছে। মানুষজন যে যার কাজে বেরোচ্ছে। তারা কেউই জানবে না, এই চেনা শহরের বুকেই প্রতি রাতে এক অচেনা, অদ্ভুত জগত জেগে ওঠে। আর সেই জগতের একমাত্র সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকে অবিনাশের ক্যানভাস।
শিল্পী হাসল। আবার অপেক্ষাপরবর্তী অন্ধকারের জন্য।
বিশ্বজিৎ মণ্ডল, কথাসাহিত্যিক, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত




