এখন সময়:রাত ৯:৫১- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৯:৫১- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : প্রতিবাদ-প্রতিরোধে ও পঙ্ক্তিমালায় চট্টগ্রাম

শিমুল বড়ুয়া :

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমার্থক, পরস্পর অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। যতদিন বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র থাকবে, গাঢ় সবুজের মাঝে লাল বৃত্ত খচিত জাতীয় পতাকা থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম অমর-অক্ষয় হয়ে বিশ্বব্যাপী ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হবে। স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনে তাঁর অনন্যসাধারণ ভূমিকার কথা জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তাঁর বলিষ্ঠ, সাহসী, দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে বাঙালি স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। ইতিহাসের এক যুগ সন্ধিক্ষণে তিনি সকল প্রকার সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ওঠে স্বাধীনতার জন্য ডাক দিয়েছিলেন। নয় মাস ব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে তিনি অনুপস্থিত থেকেও সকল বাঙালির মনোজগতে এক অবিনাশী প্রেরণামূলক শক্তি হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে গেছেন। তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে ছিলেন আপোসহীন, নির্ভীক ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে সকল প্রকার আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফার আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল তাঁর বজ্রকন্ঠ আহ্বানে, তিনি পরিণত হয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত স্থপতিতে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের আত্মদান ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ পরিচালনায়ও তিনি একজন সফল-বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকা রাখেন।

 

বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে মাত্র চুয়াল্লিশ মাসের শাসনামলে যুগোপযোগী আধুনিক সংবিধান প্রণয়ন, ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার, ভারতের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন, ওআইসি সম্মেলনে যোগদান, ড. কুদরত-এ খোদা শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে একটি বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতি উপহার প্রদান, কলকারখানা জাতীয়করণ, টাকশাল প্রতিষ্ঠা, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ, জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদান, চীন ও সৌদি আরব ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন, সর্বপ্রথম জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দান, আরব দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, শরণার্থী পুনর্বাসন, কুমিল্লায় সর্বপ্রথম সামরিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা, তাঁত বোর্ড গঠন, সিনেমা শিল্পের বিকাশে এফ ডি সি গঠন ইত্যাদি কর্মযজ্ঞ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মজবুত ভিত রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি  ক্ষুদ্র দেশের রাষ্ট্রনায়ক হলেও তিনি কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় একজন আঞ্চলিক নেতার মর্যাদা লাভ করেছিলেন। কূটনৈতিক ফারুক চৌধুরীর মতেÑ ‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের স্বার্থউন্নয়নে তাঁকে দেখেছি একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় নিবেদিতপ্রাণ। দেশ-বিদেশে তাঁকে দেখেছি অন্যসব রাষ্ট্রনায়কের মাঝে সাহসী, সংকল্পবদ্ধ, উন্নত শির। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠায় তাঁকে দেখেছি অনন্যসাধারণ এক স্থপতির ভূমিকায়।’১

তারপরও দেশি-বিদেশি শত্রুর প্ররোচনায় কিছু স্বাধীনতা বিরোধী কুলাঙ্গার সেনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোর বেলায় নৃশংসভাবে হত্যা করে, দুই কন্যা সন্তান বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকার কারণে বেঁচে গেছেন। এছাড়া একই সময়ে সেরনিয়াবাত ও শেখ মনি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। এই রকম বর্বর-নির্মম ও জঘন্যতম হত্যাকা- পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা, দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা মানে এক অর্থে বাংলাদেশকে হত্যা করা, তিনি জাতির স্থপতি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতীক। একই সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ ও কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে ও জাতীয় চারনেতাকে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের অভিমত হচ্ছে: ‘স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই মৌল নীতির ওপর। এই রাষ্ট্রের চার নীতিই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে মৌলিকভাবে পৃথক করেছে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রের পরিকল্পনা মাফিক পাকিস্তানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করার চক্রান্ত হলো বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি। এই সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ধারায় বাঙালি, বাংলা ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হানার পদক্ষেপই হচ্ছে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাতার অবর্তমানে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ যাতে পুনরায় ফিরে আসতে না পারে এবং বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করার অশুভ লক্ষ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটকাবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। উভয় হত্যাকা- একই সূত্রে গ্র্রথিত বলে মনে করেন ইতিহাসবিদগণ।’২

বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারতের গোয়ান্দা সংস্থা ‘র’ হত্যার ষড়যন্ত্র আচ করতে পেরে বঙ্গবন্ধুকে বার বার নানাভাবে সতর্ক করেছিলেন। বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গকারী বঙ্গবন্ধু কর্ণপাত করেননি,  ষড়যন্ত্রকে গুরুত্ব দেননি; বরং বলতেন, ‘ওরা আমার সন্তান, ওরা আমার কোনো ক্ষতি করবে না।’ তাঁর অতিরিক্ত ভালোবাসার ও উদার মহৎ চিন্তার মাশুল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দিতে হলো। হত্যাকা-ের পর পর সংবাদ মাধ্যমসহ তাঁর দলের নেতৃবৃন্দ, ক্ষমতাপ্রাপ্ত সামরিক বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ, অনেক সুধীজন নীরব ভূমিকা পালন করে। অনেক শীর্ষনেতা ক্ষমতাদখলকারী খোন্দকার মোশতাক আহমেদ সরকারে যোগদান করেন এবং অনেকে হত্যাকা-ের পক্ষে অভিমত প্রকাশ করতে থাকে। যেমন: ‘দেশের ৪টি দৈনিকের কোনোটিতেই বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং সামরিক ক্ষমতা দখলের আসল কাহিনী পরিষ্কার করে তুলে ধরা হয়নি। চারটিরই প্রতিবেদন এবং সম্পাদকীয় লেখার ঢঙে অদ্ভূত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। …এ থেকে বোঝা যায় যে, এই খবরের কাগজগুলোর একটিও ক্ষমতা দখলকারী শক্তির প্রভাবমুক্ত ছিল না, তাদের লাইনে চলে আসতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর একদিনও লাগে নাই।’ দৈনিক ইত্তেফাক লিখল: ঐতিহাসিক নবযাত্রা, দৈনিক বাংলা লিখল: ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, ডেলি অবজারভার লিখল: ঐরংঃড়ৎরপধষ ঘবপবংংরঃু, ডেলি বাংলাদেশ টাইমস লিখল: চবড়ঢ়ষব ঃযধহশ অৎসবফ ঋড়ৎপবং. এমনকি মাওলানা ভাসানী পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক সরকারকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন ‘এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, আল্লাহ আপনার সহায় হোন।’ মোশতাকের পক্ষে ভাসানী সাহেব মোট ৪ বার বিবৃতি দিয়েছিলেন।৪ অথচ ভাসানী সাহেবের প্রতি বঙ্গবন্ধুর প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ ছিল।

হত্যাকা- পরবর্তীকালে দেশব্যাপী গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছিল, সাধারণ জনগণ থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ বুদ্ধিজীবীসমাজ ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহবল, বিস্মিত, ব্যথিত ও হতবাক। জাতীয় নেতারা নির্বাক, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হিতাহিত জ্ঞান রহিত। আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ সেনা ঘাতকদের নৃশংস আচরণে ও মৃত্যু ভয়ে আতঙ্কিত। যার ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে-প্রতিরোধে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও অনুসারীরা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসেনি। আবার অনেকে খোন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের যোগদান করতে দেখে মনে করেন বঙ্গবন্ধু খুন হলেও ক্ষমতায় আওয়ামী লীগই আছে, ফলে প্রতিবাদে-প্রতিরোধে এগিয়ে আসেননি, দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তাঁর উপর ১৯৭৫-এর নভেম্বরের ৩ ও ৭ তারিখ পর পর দুই বার সেনা অভ্যুত্থানে জাতীয় চার নেতা সহ অসংখ্য সেনা সদস্যের প্রাণহানি ঘটে। এতে জাতীয় সংসদ সদস্যগণ নিজেরাও রাজনৈতিকভাবে নিহত হয়ে সেনাবাহিনী নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কেউ কেউ নিরাপত্তার কারণে গ্রেফতার বরণেও প্রস্তুত ছিল। ক্রমে ঘাতকদের অত্যাচার-নির্যাতনে এবং মৃত্যু ভয়ে মানুষ বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নিতেও ভয় পাচ্ছিল। পত্রিকাগুলো খুনী মোশতাক সরকারের ও ঘাতক সেনাদের বন্দনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পত্রিকায় প্রকাশিত হতো না বঙ্গবন্ধু ও তাঁর হত্যাকা- নিয়ে কোনো ছবি, সংবাদ ও সম্পাদকীয়। আবার আত্মস্বীকৃত খুনীদের হত্যাকে জায়েজ করার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

সাধারণত বলা হয় এরকম মারাত্মক সংকটকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধ হয়নি। কেউ কেউ আরো বাড়িয়ে বলতে চান ‘ইন্না লিল্লাহে’ পড়ার মতোও কেউ ছিল না। কথাটি সত্য নয়। ঘটনার পর পরই তাৎক্ষণিকভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে মার্শাল ল ও কারফিউকে উপেক্ষা করে মিছিল-স্লোগানের মধ্য দিয়ে যেমন প্রতিবাদ সংঘটিত হয়েছিল, তেমনি ক্রমে হতাশা কেটে ওঠে সশস্ত্র প্রতিরোধের উদ্যোগ-প্রচেষ্টাও গৃহীত হয়েছিল। অনেকক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রতিবাদ মিছিল করা থেকে বিরত থাকলেও বঙ্গবন্ধু অন্তঃপ্রাণ নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনগণ ভয়, নির্যাতন, পিছুটান সর্বোাপরি মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে চরম ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে নিবেদিত ছিলেন। লেখক-বুদ্ধিজীবী সমাজও ঘটনার আকস্মিকতা-বিহবলতা কেটে ওঠে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে প্রতিবাদী পঙ্ক্তিমালায় সোচ্চার হতে থাকেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বরগুণা, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নাটোর, পাবনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, খুলনা, চাঁদপুর, যশোর, নেত্রকোনায় প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়; কোথাও তাৎক্ষণিকভাবে, কোথাও কিছুটা বিলম্বে এই প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত হয়েছিল। বরগুণার তৎকালীন মহকুমা অফিসার (এসডিও) সিরাজ উদ্দীনের (সাবেক অতিরিক্ত সচিব) নেতৃত্বে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ‘মৃত্যুর আশঙ্কা সত্ত্বেও খুনীদের পক্ষে বরগুণায় সন্ধ্যা আইন কার্যকরী না করে তিনি প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তিন দিন পর্যন্ত বরগুণায় প্রতিরোধ অব্যাহত থাকে এবং সকল দপ্তরের কাজ বন্ধ থাকে।’৫ কিশোরগঞ্জে ১৫ই আগস্ট সকাল সাড়ে ৯ টায়/১০টায় তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। সাবেক মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ এক সাক্ষাৎকারে এ সম্পর্কে বলেন, ‘তিন দিন পর কিশোরগঞ্জ শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ-মিছিলের খবর পাই। তখন এও জানতে পারি যে, সারাদেশে এরূপ মিছিল শুধুমাত্র কিশোরগঞ্জেই সংঘটিত হয়েছে। কিশোরগঞ্জের অধিবাসী হিসেবে এজন্য আমি গর্ববোধ করি। বাকশালের অনুসারী মিছিলকারী সবাইকে আমি সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাই।’৬

আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ১৯৭৫ সালের ২০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মিছিল ও বঙ্গবন্ধুর নামে স্লোগান দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ঢাকার রাজপথে প্রথম সংঘটিত মৌন মিছিল বের হয় ৪ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখ। ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে শুরু হয়ে ধানম-ির ৩২ নম্বরের বাড়িটির গেটের সামনে শেষ হয়। ‘এ প্রসঙ্গে মুনীরুজ্জামান (সাংবাদিক) বলেন, এক অভূতপূর্ব শোক-বিহবল দৃশ্যের অবতারণা হয় ৩২ নম্বরের বাড়িটির গেটের সামনে। কান্নার রোল পড়ে যায়। সমস্ত পরিবেশ হয়ে পড়ে শোকাভিভূত। এরই মধ্যে মানুষ ফুল অর্পণ করে বন্ধ গেটের সামনে। বলা যায়, যদিও শোক প্রকাশের উদ্দেশ্যে মৌন মিছিল তবু এটা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ। ওই মিছিলে অংশগ্রহণকারী ড. মোহাম্মদ হাননান বলেন, ‘একজন মাওলানা সাহেব এসে হাত উঠালেন, মোনাজাত করতে পারছেন না তিনি, শুধু আল্লাহ আল্লাহ বলে উপর দিকে তাকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। …বললেন, আল্লাহ! আমাদের বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার তুমি করবা, তুমি করবা। আল্লাহ তুমি বিচার করবা।’৭ ১৯৭৫ এর ৪ নভেম্বর বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভায় শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়, এটাই প্রয়াত বঙ্গবন্ধুর উপর কোনো প্রতিষ্ঠান গৃহীত প্রথম শোক প্রস্তাব।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পাঁচ দিনের দিন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অস্ত্র হাতে হাজারও সহযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ওপার বাংলা থেকে ২২ মাস ধরে চলে এ প্রতিরোধ যুদ্ধ। তাঁর এই তৎপরতায় বঙ্গবন্ধুর অনুসারী অনেকেই ভাবতে থাকেন, ১৯৭১ সালের মতোই ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সশস্ত্রভাবে ক্ষমতা পুনর্দখল করা সম্ভব হবে। কিন্তু ১৯৭৭ সালে ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হয়ে কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পরিবর্তে মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হলে পরে ভারতীয় সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রতিরোধ যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যুদ্ধে অনেক দেশপ্রেমিক নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন, কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন, পুলিশ-সেনাদের অত্যাচারে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে কবি-লেখক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীরাও সোচ্চার হন। হত্যাকা-ের অল্প কদিন পর আগস্টের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু স্মরণে সিলেটে মাহমুদুল হক হাতে লেখা একটি দেয়াল পত্রিকা বের করেন। ‘১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের রাজনীতি যারা মেনে নিতে পারেননি, তাদের মধ্যে অন্যতম মোনায়েম সরকার (সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি, প্রথম ও দ্বিতীয় খ-, বাংলা একাডেমি ঢাকা)। অধ্যাপক নুরুল আমীন, অধ্যাপক ডক্টর ম.

 

আখতারুজ্জামান ও তিনি এই তিনজনে মিলে ‘জাগ্রত জনতা’র নােেম প্রথমে সাইক্লোস্টাইলে ও পরে টাইডাল প্রেসে ছেপে ‘মীর জাফররা হুঁশিয়ার’ শিরোনামের একটি লিফলেট প্রকাশ করে ডাকযোগে বাংলাদেশের সকল মন্ত্রী, এমপি, ডিসি, এসপি, এসডিও সহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা এমনকি দালালদের কাছেও প্রেরণ করেন এবং সচিবালয় বিতরণের ব্যবস্থা করেন।’৮ পরে দেশের এই নাজুক পরিস্থিতিতে বড় কিছু করার প্রত্যয়ে ভারতে পাড়ি জমান, ভারতে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে জনমত সংগঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও বঙ্গবন্ধু সরকারের সাবেক সচিব কবীর চৌধুরী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। ১৯৭৬ এর মহান একুশে উপলক্ষ্যে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে গঠিত ‘একুশে উদ্যাপন ছাত্রসমাজের জাতীয় কমিটি’ মুজিব স্মরণে ‘স্বাধীনতা’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করে। কমিউনিষ্ট পার্টি ‘অমর একুশে’৭৬’ প্রকাশ করে যেখানে বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপট ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ১৯৭৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মঞ্চে অনুষ্ঠিত কবিতা পাঠের আসরে বঙ্গবন্ধু অন্তঃপ্রাণ কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ শিরোনামে একটি প্রতিবাদী কবিতা পাঠ করেন। সাহসী কবি নির্মলেন্দু গুণ কবিতাটিতে প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন অনুচ্চারিত নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কবিতাটির দু’টি স্তবক নি¤œরূপ:

‘সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালবাসি,

রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ

গতকাল আমাকে বলেছে,

আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।

আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

 

এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,

না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জুরীগুলো

কান পেতে শুনুক,

আসন্ন সন্ধ্যায় এই কালো কোকিলটি জেনে যাকÑ

আমার পায়ের তলার পুণ্য মাটি ছুঁয়ে

আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের

কথা রাখলাম, আজ সে স্বপ্নের কথা রাখলাম।

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি

আমি আমার ভালবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।’

১৯৭৭ সালে সাহিত্য সাময়িকী ‘সমকালের’ নভেম্বর সংখ্যায় বঙ্গবন্ধু বিষয়ক ছড়া, কবিতা, গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্মরণে প্রকাশিত ছড়া কবিতার সংকলন ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রবাসেও  প্রতিবাদী পত্র-পত্রিকা ‘প্রতিরোধ’, ‘সানরাইজ’, ‘বাংলার ডাক’, ‘সোনার বাংলা’, ‘বজ্রকন্ঠ’ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছিল। সশস্ত্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধকারীদের মতো কবি লেখক-সংস্কৃতিসংগঠকরাও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ছড়া-কবিতা প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও পত্র-পত্রিকা-সংকলন প্রকাশ করতে গিয়ে নানান বাধা-বিপত্তি, নির্যাতন, গ্রেফতারের সম্মুখীন হয়েছিলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সকল আন্দোলন-সংগ্রামের আস্থার জায়গা হিসেবে চট্টগ্রামকে এগিয়ে রাখতেন। জীবনের সংগ্রামী দিনগুলোতে বারে বারে চট্টগ্রাম আগমন করেছেন, চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে নিবিড় নৈকট্য গড়ে তুলেছেন, তাঁদেরকে মনে করেছেন নিবেদিতপ্রাণ বিশ্বস্ত রাজনৈতিক বন্ধু ও সহযোদ্ধা। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা সমর্থন করে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা প্রথম বিবৃতি দেন। তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহের কারণে বাংলায় ছয় দফা ঘোষণার প্রথম প্রকাশ্য আনুষ্ঠানিক জনসভা চট্টগ্রামে হয়েছিল। তাঁর অবর্তমানে তাঁর বড় কন্যা দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান চট্টগ্রামের নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামে আয়োজন করেছিলেন। চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতারা সব সময় বঙ্গবন্ধুর দুর্দিনে-সুদিনে তাঁর পাশে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু একটা কথা বলতেনÑ ‘তোরা দেখিস, যেদিন আমার চট্টগ্রাম জাগবে সেদিনই আমার বাঙ্গালি জাগবে, আমার স্বাধীনতা আসবে, আমার বিজয় আসবে।’৯ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির সবচেয়ে জঘন্যতম কালো দিবসে, সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটকালে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে-প্রতিরোধে চট্টগ্রামের নেতা-কর্মীরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের কোথাও তাৎক্ষণিকভাবে কোথাও বিলম্বে বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ মিছিল সমাবেশ সংগঠিত হয়েছিল। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের, যুবলীগের ও ছাত্রলীগের অকুতোভয় নেতা-কর্মীরা চট্টগ্রাম কলেজ, কাজীর দেউরী, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, নগরীর বাহিরে আনোয়ারা কলেজসহ বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ-মিছিলের আয়োজন করেছিলেন। এসব প্রতিবাদী মিছিলে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন অধ্যাপক ফজলে হোসেন, আ জ ম নাছির উদ্দিন, আনোয়ারুল আজিম, অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন খান, এম এ জাফর, জামাল উদ্দিন, প্রনব চক্রবর্ত্তী প্রমুখ। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামের প্রথম সারির নেতারা নবগঠিত বাকশাল (বাংলাদেশ  কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ)-এর গভর্নরদের প্রশিক্ষণ এবং বাকশাল-এর জেলা ও থানা কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়ে ঢাকায় অবস্থান করার তাৎক্ষণিকভাবে জোরালো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ক্রমে বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রামের মহান বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের উত্তরসূরিরা প্রতিবাদী মিছিল সমাবেশের পাশাপাশি সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় দেশবাসী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে সংগঠিত প্রতিরোধ যুদ্ধ সম্পর্কে যতটুকু জানে, চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কার্যক্রম সম্পর্কে ততটুকু জানে না। চট্টগ্রামবাসীর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ যুদ্ধ তেমন প্রচারের আলো পায়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যুদ্ধের নায়ক ছিলেন চট্টগ্রামের বীর সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী সৈয়দ আহমদ, এস এম ইউসুফ ও এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তাঁদের সহযোদ্ধা ছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের প্রায় শতাধিক বিপ্লবী নেতা-কর্মী। বীর মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী সৈয়দ এক পর্যায়ে প্রতিরোধ যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার লক্ষে ভারতের আগরতলা চলে যান। বীর মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ঢাকা থেকে ফিরে এসে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধ যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার জন্য গোপনে বৈঠক করেন। দুই একবার গ্রেফতারও হন, সর্বশেষ মুক্তি পেয়ে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীও সহযোদ্ধাদের নিয়ে ভারতে চলে যান। এস এম ইউসুফ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসে প্রথমে তাঁর সহকর্মী মৌলভী সৈয়দ ও এ বি এম মহিউদ্দিন সহযোগে চট্টগ্রামে সশস্ত্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যুদ্ধে কাজ করেন। পরবর্তীকালে তিনিও আগরতলায় চলে যান। তাঁরা কলকাতা-আগরতলা অবস্থান করে সহযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। আগরতলায় মৌলভী সৈয়দ ও এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী কাদের সিদ্দিকীর সাথে যোগাযোগ করেন, কিন্তু তাঁরা ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’র সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হলেন না, ‘মুজিব বাহিনী’ নামে আরেকটি বিপ্লবী দল গঠন করেন। তবে কাদের সিদ্দিকী ও তাঁর বাহিনীর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। ‘মুজিব বাহিনী’র কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার হলেন মৌলভী সৈয়দ আহমদ ও এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের রাধানগরে স্থাপিত ট্রানজিট ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন সফিউল আলম (নায়েক সফি), এই ট্রানজিট ক্যাম্প ব্যবহার করে প্রতিরোধ যোদ্ধারা ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াত করতেন। আর ক্যাম্পটি নিয়ন্ত্রিত হতো আগরতলা থেকে মৌলভী সৈয়দ, এ বি এম মহিউদ্দিন ও এস এম ইউসুফ কর্তৃক। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা ভারত থেকে ট্রেনিং ও হালকা অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে কুমিল্লা হয়ে চট্টগ্রামে প্রবেশ করে মুজিব হত্যাকারী স্বাধীনতাবিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন।

প্রতিরোধ যুদ্ধের দু’টো দিক ছিলো: প্রথমত,  প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করার লক্ষে লিফলেট, ব্যানার, পোস্টার, দেয়াল লিখনের ব্যবস্থা করা, দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র গেরিলা অপারেশন করা। আগ্রাবাদের সৈয়দবাড়ি ছিল রাজনৈতিক নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র-যুবক ও মুজিব বাহিনীর গোপন বিশ্বস্ত আস্তানা; মৌলভী সৈয়দ আহমদ প্রায় এখানেই অবস্থান করতেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদী লড়াকু সৈনিক ফকির জামাল-এর বাকলিয়ার নির্জন বাড়িটি ছিল প্রতিরোধ  যোদ্ধাদের প্রিয় গোপন আস্তানা। ছাত্রনেতা আ জ ম নাছির উদ্দিনের টেরিবাজারস্থ মহানগর হোটেল ও তাঁদের বাড়ি, ফিরিঙ্গি বাজারের শফিক আদনানদের পুরানো বাড়ি, এরকম আরো অনেক বিশ্বস্ত আস্তানায় পোষ্টার লেখা হতো। এখান থেকে ফকির জামালদের মতো লড়াকু নেতাদের অনুপ্রেরণার নির্দেশনায় নগরের দেয়ালে দেয়ালে চিকা মারার ব্যবস্থা করা হতো, পোস্টার লাগানো হতো এবং লিফলেট বিতরণ করা হতো। গ্রেফতারের হুলিয়া নিয়েও মৌলভী সৈয়দ আহমদ দুই একবার চট্টগ্রামে এসে আওয়ামীলীগের, যুবলীগের ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, অনুপ্রাণিত করে গেছেন।

‘১৯৭৭ সালের ৫ জানুয়ারি বুধবার সন্ধ্যা ৭.৩৫ মিনিটে চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বড় ধরনের একটি সফল অপারেশন চালানো হয়েছিলো। সেটার নামকরণ করা হয়েছিলো ‘সিরিজ বোমা হামলা’। চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন স্থানে একযোগে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শত্রুশিবিরে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন যারা বঙ্গবন্ধু হত্যায় হতবিহ্বল ও মনোবল হারিয়ে হতাশার গ্লানিতে ভুগছিলো তাদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা যে বাঙালি জাতি মেনে নেয়নি বিশ্ববাসীকে একথা জানান দেয়ার জন্য চট্টগ্রাম শহরের ৪০টি স্থানে একযোগে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিলো। বাঁশখালীতে পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ, কোতোয়ালি থানায় হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এছাড়া হাতে তৈরি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিলেন আন্দরকিল্লা ও নিউমার্কেট মোড়ে। আউটার স্টেডিয়ামের আনন্দমেলায়, হোটেল আগ্রাবাদের সম্মুখে, চট্টগ্রাম বন্দর ও কাষ্টমসের মাঝামাঝি স্থানে অপারেশন চালানো হয়। হোটেল আগ্রাবাদের সামনে গ্রেনেড চার্জ করতে গিয়ে মহসিন জাহাঙ্গীর (বাড়বকু-ের চেয়ারম্যান) ধরা পড়ে যান।’১০  বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম প্রতিবাদকারী মহসিন জাহাঙ্গীর অমানুষিক অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। প্রায় চার বছর কারা নির্যাতন ভোগ করেন। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জাকারিয়া, মহসিন জাহাঙ্গীর, সৈয়দ মাহমুদুল হক, কলিমুল্লা, অ্যাডভোকেট শ্যামা প্রসাদ সেন ও সৈয়দ আবদুল গনিকে বিটিভি-তে ঘাতকদের লিখে দেয়া তথ্য মুখস্ত করে জবানী দিতে বাধ্য করা হয়।

১৯৭৭ সালে ভারতের জাতীয় নির্বাচন ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটে, মোরারজি দেশাইর জনতা সরকার ক্ষমতায় আসেন। বাংলাদেশের সামরিক শাসক  জিয়ার সাথে দেশাইর চুক্তির কারণে ভারতে অবস্থানকারী বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যোদ্ধার সুযোগ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। ভারত থেকে বাংলাদেশের বিদ্রোহীদের পুশব্যাক শুরু হয়। ফলে কাদের সিদ্দিকীর ‘জাতীয় মুক্তিবাহিনী’র এবং চট্টগ্রামের মৌলভী সৈয়দ আহমদ, এস এম ইউসুফ ও এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীর ‘মুজিব বাহিনী’র বিপ্লবী কর্মকা-ের অবসান ঘটে।

ময়মনসিংহের একটি সীমান্ত দিয়ে পুশ ব্যাক করার সময় মৌলভী সৈয়দকে বিএসএফ কর্তৃক বিডিআর-এর কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সকলকে ছেড়ে দিলেও তাঁকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে সৈয়দের পিতাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আনা হয় তাঁর সন্তানকে সনাক্ত করার জন্য। সনাক্ত করার পর মৌলভী সৈয়দের পিতাকে বাঁশখালী পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, আপনার ছেলেকেও বাঁশখালী পাঠানো হবে। তবে পাঠানো হয়, জীবিত নয় মৃত। সেনা ও পুলিশের কঠোর পাহারায় তাঁকে বাঁশখালী দাফন করা হয়। চারদিন পর্যন্ত কবরস্থানে সেনা প্রহরা রাখা হয়। ‘বিন¤্র শ্রদ্ধায়

 

 

 

 

 

স্মরণ করতে হয় চট্টগ্রামের মৌলভী সৈয়দকে, তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে, ইন্দ্রিরা গান্ধীর পতনের পর দেশাই সরকার তাকে জিয়াউর রহমান সরকারের হাতে তুলে দেন। ১৯৭৭ সালের ১১ই আগস্ট প্রহসন বিচারের মাধ্যমে জেলখানার ভিতরে তাঁকে গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করা হয়।’১১ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বিএসএফ-এর মাধ্যমে পুশ ব্যাক হলে তাঁরও মৌলভী সৈয়দের মত অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তিনি গোপনে আগরতলা থেকে কলকাতায় গিয়ে মানিক চৌধুরী নামে ফেরারি জীবন শুরু করেন। প্রায় দুই বছর কলকাতায় কখনো হোটেল বয়, কখনো হকার, কখনো সাবকন্ট্রাকটরি করে ফেরারি জীবন অতিবাহিত করেন। ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর সহযোগীরা দেশে ফিরে আসেন।

১৯৭৬ সালের ৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি ছিল রাষ্ট্র বনাম মৌলভী সৈয়দ গং। এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত এক লেখায় উল্লেখ করেন : ‘মামলাগুলো হলÑ কোতোয়ালী থানার মামলা নং ৭(১১)৭৬, ৮(১১)৭৬ ও ৯(১১)৭৬। আসামীদের মধ্যে ছিলেন মৌলভী সৈয়দ আহমেদ (চট্টগ্রাম শহর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বাকশালের সাধারণ সম্পাদক), এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী (চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি), সৈয়দ আবদুস সাত্তার (আগ্রাবাদ), সৈয়দ আবদুল গণি (আগ্রাবাদ), সৈয়দ মাহমুদুল হক (আগ্রাবাদ), এ্যাডভোকেট শ্যামল সেন (আনোয়ারা), সৈয়দ মোহাম্মদ জাকারিয়া (আগ্রাবাদ), এ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন হারুন (সীতাকু-), নায়েক সফি ওরফে সফিউল আলম (সীতাকু- পৌরসভার সাবেক মেয়র), সুভাষ আচার্য্য (বাঁশখালী), শফিকুল ইসলাম (বাঁশখালী), ফকির জামাল (বাকলিয়া), ইঞ্জিনিয়ার দীপেশ চৌধুরী (পটিয়া), পীযূশ রক্ষিত (বোয়ালখালী), কেশব সেন (বোয়ালখালী), মোহাম্মদ ইউনুস (হাটহাজারী, চট্টগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা পরিষদের মহাসচিব) ও মোজাম্মেল হক।’১২ দৈনিক আজাদীতে ‘চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে বিচারিক মামলার রিপোর্টিং করতেন এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। কোন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে না আসায় এবং মামালার আলামত ঠিক মতো উপস্থাপন করতে ব্যক্ত হওয়ায় মার্শাল ল ট্রাইব্যুনাল রায় প্রদানে বিলম্ব করে। ইতোমধ্যে মার্শাল ল উঠে গেলে মামলাটি বেসামরিক আদালতে স্থানান্তর করা হয়। অবশেষে আলামত ও প্রমাণের অভাবে মামলাটি ডিসমিস হয়ে যায়। আসামীরা বেকসুর খালাস পান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের অসংখ্য নেতা-কর্মী প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যুদ্ধে জীবনের মায়া ত্যাগ করে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও লাল সালাম। তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শেকড় সন্ধানী লেখক গবেষক জামাল উদ্দিন রচিত ‘আগস্ট ট্র্যাজেডি: অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে।

চট্টগ্রামের কবি সাহিত্যিক লেখক বুদ্ধিজীবীরা শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে কলম ধরেছেন। রচনা করেছেন প্রতিবাদী ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ; প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধু বিষয়ক সংকলন, সাময়িকী, লিফলেট ও পত্র-পত্রিকা। চট্টগ্রামের লেখক সাহিত্যিক প্রকাশকদের প্রতিবাদী লেখা প্রকাশনা শুধু চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল না। ঢাকাসহ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবাষিকীতে ১৯৭৬ সালের ১৫ই আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া খোরশেদ আলম সুজন (বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা)-এর উদ্যোগে এক পৃষ্ঠার একটি প্রচারপত্র প্রকাশিত হয়। প্রচারপত্রটির অর্ধেক জুড়ে ছিল কাঠের ব্লকে মুদ্রিত বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ছবি, নিচের অংশে ছিল ৩৬ পয়েন্ট টাইপে ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত একটি গানের পঙ্ক্তি : ‘বলো কি তোমার ক্ষতি/জীবনের অথৈ নদী/পার হয় তোমাকে ধরে/দুর্বল মানুষ যদি।’ গোপনে বিলিকৃত প্রচারপত্রটি বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মঞ্চে কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ শিরোনামের একটি প্রতিবাদী কবিতা পাঠ করেন। কবিতাটি সারা দেশে লেখক, সাহিত্যিক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। তার ঢেউ সুদূর চট্টগ্রামের লেখকসমাজের অন্তরেও প্রভাব পেলেছে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে গোপনে কবিতাটি ছাপিয়ে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেন। এই দূরদর্শী সাহসী কাজের অন্যতম উদ্যোক্তা কবি মিনার মনসুর এই সম্পর্কে বলেন : ‘কয়েক মাসের ব্যবধানে আমাদের হাতে আসে কবি নির্মলেন্দু গুণের সেই অসামান্য কবিতাটিÑ ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’। বাংলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে স্বকণ্ঠে কবিতাটি পাঠ করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সে কবিতা তখন আমাদের ভেতরে যে কী বিপুল অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। তাৎক্ষণিকভাবে কবিতাটি শত শত কপি গোপনে মুদ্রিত করে আমরা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিই। বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত ভূপেন হাজারিকার গানের সেই বাণী এবং নির্মলেন্দু গুণের এই কবিতা শুধু যে আমাদের প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল তাই নয়, হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো আমরা প্রতিবাদের সর্বোত্তম পথটিও পেয়ে যাই। সেই শুরু।’১৩

চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণিকা হিসেবে ১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট কবি মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী ‘এপিটাফ’ প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চারটি প্রবন্ধ ও ১২টি কবিতা ও একটি সম্পাদকীয় সংবলিত প্রকাশনাটির প্রচ্ছদে ছিল বঙ্গবন্ধুর স্মরণীয় কয়েকটি বাণী। সংকলনটি প্রকাশ করতে গিয়ে সম্পাদকদ্বয় পুলিশের বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন, বার বার প্রেস পাল্টাতে হয়। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল হারুন-এর সহযোগিতায় একটি বৌদ্ধ সংগঠনের প্রতিষ্ঠান ‘অগ্রসার প্রিন্টিং প্রেস’ থেকে অতি গোপনে সংকলনটি প্রকাশিত হয়। এই কষ্টকর ভয়াবহ আতঙ্কময় অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কবি মিনার মনসুর উল্লেখ করেন : ‘কালিঝুলিময় প্রায় অন্ধকার ভৌতিক সেই প্রেসে বাইরে তালা দিয়ে রাতে আমরা কাজ করতাম লুঙ্গি পড়ে মাথায় টুপি দিয়ে। তখনই আমরা খবর পাই যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচারপত্র প্রকাশ করার কারণে সেনা গোয়েন্দারা তুলে নিয়ে গেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এক ছাত্রসহ দুই তরুণকে। তাদের মধ্যে একজন প্রাণে বেঁচে গেলেও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন সেনা নির্যাতনে।’১৪

১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা থেকে সাহিত্য সাময়িকী ‘সমকাল’-এর নভেম্বর সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এই সংখ্যায় চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান অধ্যাপক আবুল ফজলের ১৫ই আগস্টের হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে রচিত ‘মৃতের আত্মহত্যা’ শিরোনামের একটি গল্প প্রকাশিত হয়। গল্পটি সাহিত্যিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কপি করে বিলি হয়ে হাতে হাতে ফিরতে থাকে। একই প্রেক্ষিতে আবুল ফজল ‘নিহত ঘুম’, ‘ইতিহাসের কণ্ঠস্বর’ ও ‘কান্না’ শিরোনামে আরও ৩টি গল্প লিখেন। ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে গল্পকারের এই চারটি গল্প নিয়ে ‘মৃতের আত্মহত্যা’ নামে একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কিন্তু আবুল ফজল তৎসময়ে সামরিক শাসক জিয়ার শিক্ষা উপদেষ্টা হওয়ার কারণে সুধী সমাজ কর্তৃক সমালোচনার সম্মুখীন হন। তবে উপদেষ্টা পদে থাকা অবস্থায়ই ‘মনের উপর পাপের গুরুভার’ নামাতেই তিনি গল্পগুলো লিখেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারবর্গের নৃশংস হত্যাকা-কে ‘শতাব্দীর করুণতম নিষ্ঠুরতম বিয়োগান্ত এক নাটক’ উল্লেখ করে গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেন, ‘আমি তেমন বড় লেখক নই। তবে ছোট লেখকও দায়িত্বমুক্ত নই। এ বই আমার তেমন এক ছোট দায়িত্ব পালন।’১৫ গল্প চারটি সম্পর্কে একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন লিখেন: ‘কোনো রকম রূপক বা প্রতীকের আশ্রয় নেননি  প্রতিবাদী এই লেখক। চারটি গল্পের মধ্যে প্রথম দুইটিতেÑ ‘মৃতের আত্মহত্যা’ ও ‘নিহত ঘুম’Ñ ঘটনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেছেন। আর পরের দুটিতেÑ ‘ইতিহাসের কণ্ঠস্বর’ ও ‘কান্না’Ñ পাই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আপন মানুষদের মনঃকষ্টের কাহিনী।’১৬ ১৯৭৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্রকাশিত ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ শিরোনামের ছড়া-কবিতার সংকলনের ৭ম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয় দেশবরেণ্য ছড়াকার সুকুমার বড়–য়ার ছড়া ‘৭ই মার্চ’। ছড়ার প্রথম অংশে তিনি বলেন: ‘হাজার বছর বন্দি থেকে/শিকল ভাঙ্গার স্বপ্ন দেখে/সাতই মার্চ একাত্তুরে/ডাক দিল কে এমন সুরে?/রক্ত দিয়েছিÑ রক্ত দেবো/মুক্তি সনদ ছিনিয়ে নেবো।’

এদিকে চট্টগ্রামে নানা ভয়-বাধাকে অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণিকা ‘এপিটাফ’ প্রকাশ করতে পেরে সম্পাদকদ্বয়ের সাহস বেড়ে যায়। পরের বছর ১৯৭৯ সালে বঙ্গবন্ধুর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সেপ্টেম্বর মাসে দশটি মূল্যায়ন ধর্মী প্রবন্ধ ও পঁচিশটি কবিতা নিয়ে স্মারক সংকলন ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া উনিশ বছর বয়স্ক তরুণ কবি মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। কবি সম্পাদক মিনার মনসুর উল্লেখ করেন, ‘আমাদের জানামতে, পঁচাত্তর পরবর্তীকালে বাংলাদেশে ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ই হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত প্রথম স্মারক সংকলনÑ যেখানে কবিতা ছাড়াও মূল্যায়নধর্মী খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিলো। লেখক তালিকাটিও ছিল খুবই সমৃদ্ধ। তার মধ্যে ড. মযহারুল ইসলাম, বোস প্রফেসর ড. আবদুল মতিন চৌধুরী, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ‘সমকাল’ সম্পাদক ইসমাইল মোহাম্মদ, বরেণ্য সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত, স্বনামখ্যাত অন্নদাশঙ্কর রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, জাহিদুল হক, ওমর আলী, কামাল চৌধুরী, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, জাফর ওয়াজেদ, স্বপন দত্ত, খালিদ আহসান, শাহাদাত বুলবুল, ফজলুল হক সরকার, অধ্যাপক শামসুল আলম সাঈদ, আবসার হাবীব, আলমগীর রেজা চৌধুরী, শিশির দত্ত, সনজীব বড়–য়া, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, ইসরাইল খান, খোরশেদ আলম সুজন ও চাকসুর সাধারণ সম্পাদক জমীর চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।’১৭ সম্পাদকদ্বয় ১২৫০ কপি ছেপেছিলেন। প্রকাশের মাত্র একমাসের মধ্যেই সব কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।

পরের বছর ১৯৮০ সালে ১৫ই আগস্টে সম্পাদকদ্বয় আরো একটি বিশেষ বুলেটিন ‘আবার যুদ্ধে যাব’ শিরোনামে প্রকাশ করেন। তাঁদের মতেÑ ‘এটাকে এক অর্থে ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’-এর সম্পূরক প্রকাশনাও বলা যেতে পারে।’ এতে সে সময়ের দেশবরেণ্য রাজনীতিক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ স্বনামখ্যাত অনেকের বঙ্গবন্ধু হত্যার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছিল। তার মধ্যে স্বনামখ্যাত আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, সুফিয়া কামাল, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবদুল মতিন চৌধুরী, কলিম শরাফী, কবীর চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, দেবদাস চক্রবর্তী, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, আলী আকসাদ, রাহাত খান, বেলাল চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আলী যাকের, আবদুল জব্বার, কবীর আনোয়ার ও কামাল চৌধুরীসহ বিশিষ্ট জনের স্বাক্ষরসংবলিত প্রতিক্রিয়া ছাপা হয়েছিল। এক্ষেত্রেও বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক মিনার মনসুর মনে করেন, ‘আমার বিশ্বাস, এই বুলেটিনটি বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তীকালে প্রকাশিত প্রতিবাদী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’১৮ ১৯৮৩ সালে কবি মিনার মনসুরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’ প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সরকার বাজেয়াপ্ত করে। কবি অনেকদিন সরকারি রোষানলে পরে পালিয়ে বেড়ান। তবে তাঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে আত্মত্যাগের ও প্রতিবাদী চেতনার যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন তা পরবর্তীকালে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রফেসর ড. শামসুল আলম সাঈদের পরামর্শে এবং ছাত্রনেতা আ জ ম নাছির উদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘বর্তিকা’ নামের দেয়ালিকা প্রকাশ পায়। দেয়ালিকাটি সম্পাদনা করতেন মোহাম্মদ ঈছা। পত্রিকাটিতে

 

বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা হত্যার প্রতিবাদে ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ প্রকাশ করা হত। শিক্ষার্থীদের মাঝে পত্রিকাটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। চট্টগ্রামে ‘লক্ষ মুজিবের কণ্ঠে’ শিরোনামের আরো একটি সাহসী প্রকাশনা ছিল। সাহিত্য সংকলনটি পর পর ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়। সম্পাদক ছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা এস. এম জামাল উদ্দীন বাবুল। প্রথম সংখ্যায় লেখক তালিকায় ছিলেনÑ ড. আবদুল মতিন চৌধুরী, অধ্যাপক আবুল ফজল, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, শেখ শহীদুল ইসলাম, নির্মলেন্দু গুণ, রাহাত খান, মহাদেব সাহা, খান শফিকুল মান্নান, সুখময় চক্রবর্তী, মোঃ জহির খান, শামসুল আলম সাঈদ ও শফিক আদনান। দ্বিতীয় সংখ্যায় লেখক তালিকায় ছিলেনÑ আবু জাফর শামসুদ্দিন, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ড. দুর্গাদাশ ভট্টাচার্য, সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওবায়দুল কাদের, মিজানুর রহমান মিজান, খান শফিকুল মান্নান, আহমদ খালেদ কায়সার।১৯ দেশের ভয়াবহতম সংকটকালে সকল প্রকার অত্যাচার নির্যাতন সর্বোপরি মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের অকুতোভয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা অস্ত্রহাতে আর লেখক সাহিত্যিকরা কলম হাতে জাতির পিতা হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

সারাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যোদ্ধারা জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করেছিলেন, এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যুদ্ধে অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন, পঙ্গু হয়েছেন, অনেকে ফাঁসির কাষ্ঠে জীবন উৎসর্গ করেছেন। গবেষণা না করেও বলা যায়, আক্ষরিক অর্থে তাঁদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক সফলতা তেমন কিছু আসেনি। তবে পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনীদের বিচার কার্যক্রম ও ফাঁসির রায় কার্যকর করা ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যুদ্ধ-সংগ্রামের ধারাবাহিক উদ্যোগ-প্রচেষ্টার ফল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধকারীদের স্বীকৃতি দেননি। কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বার বার তাঁর লেখা-বক্তব্যে সরকার সমীপে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের জন্য দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে লেখক, সাংবাদিক, বিচারক, বুদ্ধিজীবীরাও পক্ষে মতামত দিচ্ছেন। এ বিষয়ে মাননীয় বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের বক্তব্যের অংশ বিশেষ খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি এক দৈনিক পত্রিকায় লিখেনÑ ‘প্রতিরোধ যোদ্ধারা একটি সাংবিধানিক সরকার ও তার প্রধানকে অসাংবিধানিক পন্থায় উৎখাত করার ঘটনার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন। তারা হয়তো সেদিন তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি।… অনেক বাধা পেরিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে যা ওই প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কর্মকা-ের আংশিক বিজয়।… বিচারপতিগণ মোশতাক, সায়েম ও জিয়ার শাসনকালকে অবৈধ ঘোষণা করেন, যা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও অনুমোদন করেন। বিলম্বে হলেও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত যে সিদ্ধান্ত ও অভিমত দিয়েছেন, নিশ্চিতভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের প্রতিরোধ যোদ্ধারা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর যে কর্মকা- ও উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেইটি প্রকারান্তরে বিচারিক ভাষায় প্রতিফলিত হয়েছে।… তাই যে দেশপ্রেমিক বীর যোদ্ধারা একদিন একটি অবৈধ্য অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলকারী সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নিয়ে এ দেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা কর্তৃক গঠিত সাংবিধানিক সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তারা আজ নিশ্চয়ই সাংবিধানিক সরকার ব্যবস্থার পক্ষের যোদ্ধা হিসেবে একটি সরকারি বা রাষ্ট্রীয় ও আইনী স্বীকৃতির দাবি রাখেন।… এই স্বীকৃতি তাদের প্রাপ্য। সত্য প্রতিষ্ঠায় এই স্বীকৃতি ভূমিকা রাখবে।’২০ সংবেদনশীল সদাশয় বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে এই স্বীকৃতি আমরা প্রত্যাশা করতে পারি। চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যোদ্ধা যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন, যাঁরা এখনো বেঁচে আছেন তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাচ্ছি।

 

তথ্যসূত্র :

১। স্মরণে বঙ্গবন্ধু, ফারুক চৌধুরী, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, জুন ২০০৫, পৃ. ১৩৪

২। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জীবন ও রাজনীতি (দ্বিতীয় খ-), সম্পাদক মোনায়েম সরকার, বাংলা একডেমি ঢাকা, তৃতীয় পুনঃমুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০২১, পৃ. ৭২০

৩। ভারতীয় গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-, চৌধুরী শহীদ কাদের, বাংলা একাডেমি ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০২২, পৃ. ৪

৪। বঙ্গবন্ধু ও ১৫ই আগস্ট প্রসঙ্গ, স্বপন দেব, বাংলা একাডেমি ঢাকা, মার্চ ২০২২,পৃ. ১৪৩

৫। বঙ্গবন্ধু হত্যা : প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, হালিম দাদ খান, বাংলা একাডেমি ঢাকা, এপ্রিল ২০২৩, পৃ. ৩৯

৬। প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৫

৭। প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৯

৮। প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬

৯। বঙ্গবন্ধু ও চট্টগ্রাম : পরস্পর অবিচ্ছিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ (সেমিনার প্রবন্ধ), শিমুল বড়–য়া, লতিফা সিদ্দিকী ডিগ্রি কলেজ, কুমিরা, সীতাকু-, ১৭ মার্চ ২০২৩, পৃ. ৪

১০। আগস্ট ট্র্যাজেডি : অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম, জামাল উদ্দিন, বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রাম, ১৫ আগস্ট ২০২২, পৃ. ৬২

১১। বঙ্গবন্ধু ও ১৫ই আগস্ট প্রসঙ্গ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৮

১২। আগস্ট ট্র্যাজেডি : অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১০, ১১১

১৩। শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ, সম্পাদক মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী, বাংলা একাডেমি ঢাকা, এপ্রিল ২০২১, পৃ. [দশ]

১৪। প্রাগুক্ত, পৃ. [এগার]

১৫। বঙ্গবন্ধু হত্যা : প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৬

১৬। বঙ্গবন্ধু ও গণমাধ্যম, সম্পাদক ড. মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট, ঢাকা, পৃ. ১৩৩

১৭। শেখ মুুজিব একটি লাল গোলাপ, প্রাগুক্ত, পৃ. [এগার], [বারো]

১৮। প্রাগুক্ত, পৃ. [চৌদ্দ], [পনের]

১৯। আগস্ট ট্র্যাজেডি : অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০

২০। বঙ্গবন্ধু হত্যা : প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, পৃ. ১৬৯।

 

শিমুল বড়ুয়া, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

অধ্যক্ষ, লতিফা সিদ্দিকী ডিগ্রি কলেজ, সীতাকুন্ড, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই