এখন সময়:রাত ১১:৫৬- আজ: মঙ্গলবার-২৪শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১০ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

এখন সময়:রাত ১১:৫৬- আজ: মঙ্গলবার
২৪শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১০ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

দুপুর রঙের বৃষ্টি (পর্ব-১১)

রাজকুমার শেখ :

কদিন ধরেই ওর নোরিন ফুপুকে কেমন অন্য মনস্ক লাগছে। আজ খুব সকালে কোথায় যেন গেছিলো। নাজ অত সকালে না উঠলে মনে হয় জানতে পারতো না। অবশ্য সে কোনো কথা জিগ্যেস করেনি। অত সকালে নাজকে উঠতে দেখে ওর ফুপু বেশ অবাক হন।

কিরে আজ এত সকালে উঠলি যে? শরীর খারাপ নাকি?

না। এমনি সকালে ঘুম ভেঙে গেল।

মুখ ধুয়ে আয় চা খাবি।

নাজ আর একটু বিছানায় শুয়ে থাকতে ওর ইচ্ছে করছিল। কিন্তু তা আর হল না। কলতলে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নেয়। সকালের ঠান্ডা বাতাসটা দারুণ লাগছে। মুক্ত বাতাস। নাজ উপভোগ করে বাতাসটা। কেমন চারপাশে সবুজ গন্ধ। পাখি গুলো ডাকছে। মোতিঝিলের ওপর দিয়ে একটা শঙ্খ চিল ডেকে উড়ে পালালো। নাজের এই বাড়িটা অনেক পুরনো। নোরিন ফুপু এখানে কম থাকতেন। কি একটা কাজে যুক্ত ছিলেন। সব কিন্তু ভেঙে বলেন না। আধা কথা পেটের ভিতর থেকে যায়। নাজ অবশ্য তেমন কিছু জিগ্যেস করে না। ও কলেজের পড়াশোনা নিয়ে থাকে। আপন ঘরে শুয়ে বসে ওর সময় কেটে যায়। আম বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাখিদের গান শোনে। মিনা বা রমির কথা ভাবে। রাতে দূরে কোথায় মেল ট্রেন চলে যায় শব্দ করে। ও কান পেতে সে শব্দ শোনে। শীতের রাতে বেশি ভালো লাগে। পাতাদের খসখস শব্দ। মতিঝিল এর আসে পাশে পেঁচা ডেকে যায়। ভারি রাতে গা কেমন শিরশির করে ওঠে। নাজ ঘুমোতে পারে না। তা ছাড়া এদিকে খুব শুনশান। মানুষ রাতবিরেত একা বের হতে ভয় পায়। গভীর আম বাগানে একা কেউ যেতে পারে না। পুরোনো দিনের নবাবী আমলের বাড়ি ভেঙে পড়ে। তার ভেতর যে কার বাস তা কেউ বলতে পারবে না। ঘসেটি বেগমের মতিঝিল প্রাসাদ ভেঙে গেছে কোন কালে। সেখানে এখন গভীর জংলা। কেউ ওদিকে যায় না। এখনো কেমন সব রহস্য মনে হয়। এ শহরটাকে বোঝা যায় না। নাজের যখন ঘুম আসে না তখন ওর মনে কত কী-ই ভিড় করে আসে। এ শহরে কত রক্ত ঝরেছে। সিরাজ দৌলা থেকে আরও কত জন মরেছে। হীরাঝিল দখল করে ইংরেজদের দাপাদাপি।  এ সব তো সহজ করে দিয়েছিল ঘসেটি বেগম থেকে জগৎ শেঠ। কে ছিল না সিরাজের বিরুদ্ধে!  মসনদ চায় সবার। বাংলার সুবেদার। এত লোভ!  নাজকে বেশ বিচলিত দেখায়। ও অন্য মনস্ক হতে চায়। জানালা দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। আজ মৌটুসীটা নেই। ওর ডাক ও শুনতে পাচ্ছে না। ও এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। বেলা বয়ে যায় খোসবাগের আম গাছাটার ওপারে।

ও যখন ঘুম থেকে উঠলো তখন রাত নেমেছে।  আজ ওর উঠতে ইচ্ছে করছে না।  ওর রাতের খাবার নোরিন ফুপু দিয়ে গেলেন। ওকে খেয়ে নিতে বললেন। আজ খুব তাড়াতাড়ি নোরিন ফুপু ওর ঘর থেকে চলে গেলেন। অন্য সময় হলে বসে একটু পুরোনো দিনের গল্প বলেন। নাজ সেব গল্পতে বেশ মজা পায়। কত অজানা কথা। সে সবের মধ্যে ও ঢুকে পড়ে।

নাজ আজ একটু দেরি করেই রাতের খাবার খেয়ে খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। আকাশে আজ চাঁদ উঠেছে। আমের পাতা গুলো চাঁদের আলোতে চিকচিক করছে। নাজ চুপ করে দেখছিল সুন্দর দৃশ্য। জোনাকি বনময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। আজ ওর ঘুম আসছে না। রাত কত হল কে জানে। ও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এমন সময় হঠাৎ বাড়ির গেট গোলা শব্দ। নাজ চমকে যায়। একটু এগিয়ে দেখছে তার ফুপু চাদর মুড়ি দিয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গেলেন। এত রাতে কোথায় গেলেন? নাজ বেশ অবাক হয়। নাজও সব লাগিয়ে দরজা খুলে ওর ফুপুর পিছন নেয়। খুব ধীরে ও এগোতে থাকে। নোরিন ফুপু একটু পা চালিয়ে হাঁটতে থাকেন। নাজের যেতে বেশ কষ্ট হয়। ও জোরে হাঁটতে পারছে না। কিন্তু ওর মনে প্রশ্ন জাগে, এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন ফুপু?  এর আগেও কি গেছেন?

ও জানে না। রাতের মেল ট্রেনটা চলে গেল শব্দ করে। তাহলে এখন অনেক রাত। নাজের কেমন গা ভার হয়। ও কি সত্যি করে ফুপুকে বাড়ি থেকে বের হতে দেখেছে? ওর মনে কেমন খটকা লাগে। পা কেমন হঠাৎ অসার লাগে। তবু ও হাঁটতে থাকে। এমন সময় একটা জাগায় এসে ওর ফুপু থেমে যান। বামের এক ফালি একটা রাস্তা চলে গেছে গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে। সেই রাস্তা ধরলেন। নাজও এগোতে থাকলো। ও দেখছে, একটা বড় বাগান। অনেক দিনের। এক সময় যে সুসজ্জিত ছিল তা দেখে বোঝা যায়। চাঁদের আলোতে সব বোঝা যাচ্ছে। বাগানের ভেতর দিয়ে রাস্তা।  নোরিন ফুপু  একটি দরজার সামনে এসে থেমে গেলেন। তারপর হঠাৎ মোমবাতি জ্বালিয়ে দরজার তালা খুললেন।  তার মানে এ ঘরের চাবি উনার কাছে থাকে। কিন্তু এখানে এত রাতে কেন এলেন? দিনেও তো আসতে পারতেন। নাজ ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। এখানে এক সময় কেউ থাকতো মনে হয়। নোরিন ফুপু তাকে চিনতেন। নাজ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। নোরিন ফুপু ভেতরে ঢুকে গেলেন। আর অমনি নাজও এগিয়ে এলো। ও ঘরে ঢুকে অবাক। ঘরে আরও কয়েকটি মোমবাতি জ্বলছে। কেমন একটা গন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে। ঘরে ঝুলছে ঝাড়বাতি। মেঝেতে কারপেট পাতা। এক পাশে তানপুরা রাখা। পানের পিকদানি। দামি জিনিস সব রাখা। কেউ যেন এই তানপুরা রেখে উঠে গেল। বোঝায় যায় নবাবী আমলের সব। পাশেই সিড়ি। ওপর মহলে উঠে গেছে। নোরিন ফুপুকে দেখা গেল না। নাজ আর দেরি  করে না। ও সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায়। ওপর ঘরে দামি আসবাবপত্র। দেওয়ালে একটা মেয়ের আঁকা ছবি। মেয়েটি খুব সুন্দর। মোমবাতির আলোতে কেমন মায়াবি হয়ে উঠেছে। নোরিন ফুপুকে এখানে দেখতে পেল ও। এখানে কি করছেন? কি যেন খুঁজছেন? নাজ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছে। খাটের তল থেকে একটা বাক্স বের করলেন নোরিন ফুপু। অনেক দিনের পুরোনো বাক্স। মোমবাতির আলো পড়ে কেমন রহস্য রহস্য লাগছে। ঘরটা দেখে মনে হয় কোনো রাজরানির ঘর। নিশ্চয়ই তেমন কেউ থাকতো। তবে এ বাড়িতে যে নোরিন ফুপুর আসা যাওয়া ছিল তা দেখে বোঝা যাচ্ছে। তবে এ বাড়ির সাথে কি সম্পর্ক?  তা ও জানে না। নাজ চুপ করে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে। নোরিন ফুপু বাক্স খুলে একটা কি যেন বের করলেন? ও ঠিক ঠাহর করতে পারে না। নোরিন ফুপুর হাতে একটা কি যেন ঠেকলো।  টুং করে বেজে উঠলো। মনে হল এত কাল পড়েও তাতে যেন  প্রাণ আছে। কেউ ছুঁলেই তা বেজে উঠবে। কেমন এক ঘোর লেগে যায় নাজের। দেওয়ালে ওই ছবিটাই বা কার? এত বড় খাট। দামি চাদরে মোড়া। আয়না। সব যেন ঝকমক করছে মোমবাতির আলোতে। সদর রাস্তা থেকে এটা দেখা যায় না। বাগানের ভেতর দিয়ে আসতে হয়। তবে কি এটা বাগান বাড়ি?  নাজ ভাবে।

কে বা কারা বাস করতো এখানে তা ওর জানার কথা নয়। তবে যে নোরিন ফুপু সব জানবেন। জিগ্যেস করতে হবে। নাজকে নাও বলতে পারে। কেননা তাহলে ওকে লুকিয়ে রাতে এখানে আসতেন না।তবে ওকে কি সব লুকাই? ওর মাকে সে দেখেনি। মায়ের কথা কখনো বলেন না। ওর মায়ের জন্য মনটা খারাপ করে। মা কেমন দেখতে ছিলেন তা ও জানেনা। রমি বা মিনা জিগ্যেস করলে ও সে কথা এড়িয়ে যায়। নাজ তখন খুব কষ্ট পায়। রাতে ঘুম আসে না। ওর বন্ধুদের সবার মা আছে। ওর বুকের তলটাতে বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগে। যা পূর্ণ হবে না কোনো দিনই।  ওর চোখ দুটো জলে ভিজে যায় আপনা থেকে।  ও নিজেকে সামলায়।

এমন সময় হঠাৎ নোরিন ফুপু ঘর থেকে বের হয়। তার আগেই নাজ বাইরে বেরিয়ে আসে। নিঝুম রাত। রাত চোরা পাখি ডাকছে আম বাগানে।  শিশিরের গন্ধ। নাজ একটা গাছের আড়ালে এসে দাঁড়ায়।  নোরিন ফুপু দরজাটা বন্ধ করে তালা দেয়। তারপর দূত পায়ে হেঁটে চলে। নাজও চলে। নাজ তার আগেই এসে ওর ঘরে চলে আসে। তারপর ও শুয়ে পড়ে। এক সময় গেট লাগানো শব্দ পায় ও। নাজ আর ঘুমোতে পারে না। কেমন এক ভাবনা ওকে পেয়ে বসে। রাত বয়ে যায়। মতিঝিল এর আম বাগানে একটা পেঁচা ডাকছে। বুক হিম হয়ে যায় সে ডাকে। নাজ বেশ ভয় পেয়ে যায়। পাস বালিশটাকে আঁকড়ে ধরে শুয়ে থাকে। ওর আজ ঘুম আসবে না। অনেক কথা ওর মনে ভিড় করে আসছে। নোরিন ফুপু কেমন রহস্য মানুষ। তাকে ধরা দেন না। নাজ কিছু ভেবে পায়না। ও কবে  বলবে ওঁকে? জিগ্যেস করলে যদি অন্য কিছু মনে করেন? তবে ও মনে  করে, ওই বাড়িটার মধ্যে সব কথার উত্তর লুকিয়ে আছে। তাকে সে উত্তর পেতেই হবে। নাজ মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। তারপর ও ঘুমিয়ে পড়ে। রাতের সব তারাও যেন ঘুমিয়ে যায়।

 

রাজকুমার শেখ, গল্পকার, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

বিশ্ব নারী দিবসের পুনর্পাঠ : বহুমাত্রিক নারীর নতুন ভাষ্য

শাহেদ কায়েস   নারীর ইতিহাস কোনো একরৈখিক অগ্রযাত্রা নয়—তা বহু পথে বয়ে চলা নদীর মতো, যেখানে সংগ্রাম, প্রেম, প্রতিরোধ, রাজনীতি, শ্রম, মাতৃত্ব, শিল্প, দর্শন ও

আন্দরকিল্লার ইফতার অনুষ্ঠানে সুধীজনদের অভিমত বাঙালি জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার চিহ্নটিই অনির্বাণ অস্তিত্বের প্রতীক

আন্দরকিল্লা ডেক্স : শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজভাবনামূলক কাগজ ‘আন্দরকিল্লা’র ইফতার আয়োজনে সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার তাঁর স্বাগত বক্তব্যে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, আন্দরকিল্লা কোনো বলয়বদ্ধ সীমানায়

প্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসো নারী  

গৌতম কুমার রায় বিংশ শতাব্দী বিদায় হওয়ার পরে এসেছে একবিংশ শতাব্দী। বিজ্ঞান এগিয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে পুরুষ। কিন্তু নারী ! শুধু পিছিয়েছে নারী। কেন

আদিবাসী নারী

কুমার প্রীতীশ বল   ‘হৈ হৈ হৈ জুমত  যেবং. জুমে যেইনে গচ্ছা সুদা তুলিবং. গচ্ছা সুদা তুলি নেই টেঙ্গা কামেবং।’ চাকমা এই গানটির বাংলা অনুবাদ

মহাশ্বেতা দেবী: দর্শন, সাহিত্য ও সমাজচেতনার প্রতিফলন

রওশন রুবী   মহাশ্বেতা দেবী উপমহাদেশের একজন শক্তিমান ও প্রখ্যাত লেখক। তাঁর শতবর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য শব্দের সীমা অতিক্রম করে মানবতার গভীর নৈতিক শক্তিতে